মার্কিন প্রতিষ্ঠান এল৩হেরিসের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১২২ কোটি টাকার প্রথম ট্যাকটিক্যাল রেডিও অ্যাসেম্বলি লাইন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি।
বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়ন এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি কৌশলগত চুক্তি ও প্রযুক্তি হস্তান্তর (ToT) প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো—বিদেশি আমদানির ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মাটিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম সামরিক যোগাযোগ ইকোসিস্টেমের (Sovereign Tactical Communication Ecosystem) একটি মজবুত ভিত্তি স্থাপন করা।
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ নথিপত্র এবং উচ্চপর্যায়ের চিঠিপত্র বিনিময় থেকে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘এল৩হেরিস টেকনোলজিস’ (L3Harris Technologies)-এর সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী পর্যায়ভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এই মহাপরিকল্পনার অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল পরিদপ্তর (Signal Directorate) ৪,০০০টি আধুনিক ও সুরক্ষিত ট্যাকটিক্যাল রেডিওর স্থানীয়ভাবে সংযোজন বা অ্যাসেম্বলি লাইন (Assembly Line) সুবিধা তৈরির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছে।
১১২২ কোটি টাকার সামরিক প্রজেক্ট এবং ছয় বছরের রোডম্যাপ
প্রতিরক্ষা খাতের এই মহাপরিকল্পনাটি কেবল একটি সাধারণ সামরিক কেনাকাটা বা ক্রয়ের চুক্তি নয়; এটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত রূপান্তর।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল পরিদপ্তরের পরিচালকের উদ্দেশ্যে পাঠানো এল৩হেরিস টেকনোলজিসের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা অনুযায়ী,
এই সম্পূর্ণ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯১.৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১,১২২ কোটি (১১.২২ বিলিয়ন) টাকার সমতুল্য।
এই বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিচের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলো অর্জন করবে:
- এসকেডি (SKD) উৎপাদন: ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই রাজধানী ঢাকায় সেমি-নকড-ডাউন (SKD) কিট আমদানির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে রেডিওর প্রাথমিক সংযোজন কাজ শুরু হবে।
- ছয় বছরের সক্ষমতা রোডম্যাপ: আগামী ছয় বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সেমি-নকড-ডাউন থেকে কমপ্লিটলি নকড-ডাউন (CKD) উৎপাদন লাইনে রূপান্তর।
- স্বাধীন রক্ষণাবেক্ষণ বেস: একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ মেরামত, ক্যালিব্রেশন এবং লেভেল-৪ সীমিত ডায়াগনস্টিকস সুবিধা তৈরি করা।
ফ্যালকন ৩ ট্যাকটিক্যাল রেডিও: যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল
এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এল৩হেরিস টেকনোলজিসের বিশ্বখ্যাত ‘ফ্যালকন ৩ ভিএইচএফ/এইচএফ ট্যাকটিক্যাল রেডিও’ (Falcon III VHF/HF tactical radios)।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরণের সফটওয়্যার ডিফাইনড রেডিও (SDR) সাধারণ কোনো যোগাযোগের মাধ্যম নয়;
এগুলো মূলত সুরক্ষিত ও হ্যাকিং-অযোগ্য কমান্ড-অ্যান্ড-কontrol এবং অপারেশনাল সমন্বয়ের প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
এল৩হেরিস মূলত এই সুরক্ষিত ট্যাকটিক্যাল সফটওয়্যার ডিফাইনড রেডিও তৈরিতে বিশ্বজুড়ে একচেটিয়া হিল্লোল তুলেছে।
বর্তমানে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (Pentagon) এবং তাদের মিত্র ন্যাটো (NATO) বাহিনীসহ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩,৫০,০০০-এরও বেশি ফ্যালকন রেডিও সক্রিয়ভাবে সেবা দিচ্ছে।
অতীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিশন ও অনুশীলনের জন্য RF-7800H HF, RF-7800V VHF, RF-7850M Multiband এবং RF-7850S UHF Soldier এর মতো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন রেডিও আমদানি করলেও,
এবারই প্রথম এই সংবেদনশীল ডিভাইসের সংযোজন কারখানা বাংলাদেশে স্থাপিত হতে যাচ্ছে।
দ্রুতগতির কূটনৈতিক চিঠি চালাচালি ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
নথিপত্র থেকে জানা যায়, এই অংশীদারিত্বটি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল পরিদপ্তর এবং মার্কিন মার্কিন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক ধরণের বিশেষ গতিশীলতা কাজ করেছে। বিগত ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর—এই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুই পক্ষের মধ্যে অন্তত ছয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের চিঠি চালাচালি সম্পন্ন হয়েছে,
যা এই ডিফেন্স প্রজেক্টের জরুরি প্রয়োজনের দিকটিকে নির্দেশ করে।
সামরিক আলোচনার টাইমলাইন (২০২৫):
├── গ্রীষ্মকাল: সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান ও স্থানীয় এজেন্টের মধ্যাহ্নভোজ বৈঠক
├── সেপ্টেম্বর - নভেম্বর: সিগন্যাল পরিদপ্তর ও মার্কিন এল৩হেরিস-এর মধ্যে ৬টি কড়া চিঠি বিনিময়
└── ৩০ নভেম্বর: ৪,০০০ ফ্যালকন ৩ রেডিওর চূড়ান্ত টেকনিক্যাল ও বাণিজ্যিক প্রস্তাবনা পেশ
এই প্রক্রিয়ার পেছনে পর্দার আড়ালে এক সুগঠিত সংলাপ ও আলোচনার পথ উন্মোচিত হয় ২০২৫ সালের গ্রীষ্মকালে।
ঢাকা সেনানিবাসের এক বিশেষ মধ্যাহ্নভোজ বৈঠকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান এবং স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সিইও মনজুর হোসেন জিম্মু এই চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এই আলোচনার পরই ভারত-বেঙ্গালুরুতে নিজস্ব সাবসিডিয়ারি বা আঞ্চলিক শাখা থাকা মার্কিন জায়ান্ট এল৩হেরিসকে যুক্ত করে দ্রুতগতিতে প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হয়।
বেসরকারি খাতের অন্তর্ভুক্তি ও ‘অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল’-এর ভূমিকা
বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর এই সংবেদনশীল এবং উচ্চ-প্রযুক্তিগত আমদানির সাথে একটি দেশীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক সত্ত্বার গেটকিপার বা মাধ্যম হিসেবে অন্তর্ভুক্তি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেনা সদরের অনুলিপি তালিকায় নাম থাকা ‘অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড’ মূলত সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনীসহ র্যাব ও পুলিশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবসার সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত।
যদিও এই প্রজেক্টের কারখানাটি সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং ঢাকায় একটি সুরক্ষিত জোনে স্থাপন করা হবে,
তবুও স্থানীয় বাণিজ্যিক পার্টনার হিসেবে অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনালের ভূমিকা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি কীভাবে গঠিত হবে,
তা নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মাঝে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
সংবেদনশীল যোগাযোগ ক্রয়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের এই ধরণের ওরিয়েন্টেশন দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বেসরকারি বিনিয়োগ বিকাশের একটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ফেজ ১ এবং ফেজ ২: এসকেডি থেকে লেভেল-৪ রক্ষণাবেক্ষণের কৌশলগত দিগন্ত
মার্কিন প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রস্তাবনাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয়ভাবে কোনো বিক্রেতার তৈরি অফার বা সরাসরি ক্রয় নীতি গ্রহণ করেনি।
বরং সেনাবাহিনী নিজেদের সময়সীমা ও সক্ষমতার শর্তগুলোকে মার্কিনীদের চাহিদাপত্রে (Letter of Interest) নতুন করে সংযোজন ও পুনর্গঠন করেছে।
প্রথম পর্যায় (Phase 1): এসকেডি উৎপাদন ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ
প্রাথমিক ধাপে এল৩হেরিস ঢাকায় একটি সম্পূর্ণ সুসজ্জিত সেমি-নকড-ডাউন (SKD) অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপন করবে।
এর আওতায় থাকবে উন্নত টুলিং, বিশেষায়িত টেস্ট সিস্টেম, কারিগরি নথিপত্র এবং কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশনা।
সেনা সদস্যদের জন্য থাকবে একটি ব্যাপক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ মডিউল, যার মাধ্যমে তারা আমদানিকৃত কিটগুলো নিজস্ব কারখানায় সংযোজন, পরীক্ষা এবং কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স (Quality Assurance) করতে সক্ষম হবেন।
দ্বিতীয় পর্যায় (Phase 2): সিকেডি এবং ল্যাবরেটরি অ্যাক্রেডিটেশন
প্রথম পর্যায়ের সফল বাস্তবায়নের পর এই কর্মসূচিটি একটি গভীর স্থানীয়করণ মডেল বা কমপ্লিটলি নকড-ডাউন (CKD) সক্ষমতার দিকে অগ্রসর হবে।
এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সারফেস-মাউন্ট প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ল্যাবরেটরি এবং আন্তর্জাতিক সামরিক অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি ধাপ।
এর পাশাপাশি ‘লেভেল-৪’ সীমিত রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতার মাধ্যমে সময়ের সাথে সাথে দেশের অভ্যন্তরেই অত্যন্ত জটিল মেরামত ও ক্যালিব্রেশন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে,
যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের (Supply Chain) ওপর নির্ভরতা স্থায়ীভাবে হ্রাস করবে।
মার্কিন রেগুলেটরি লাইসেন্সিং এবং সার্বভৌমত্বের সীমা
এই যুগান্তকারী চুক্তিটি বাংলাদেশের সামরিক খাতকে অনেকখানি আত্মনির্ভরশীল করে তুললেও,
এর সাথে কিছু মার্কিন কঠোর আইনি ও নিয়ন্ত্রক লাইসেন্সিংয়ের শর্ত বা রেড-লাইন যুক্ত রয়েছে।
এল৩হেরিস তাদের অফারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে,
এই প্রযুক্তি হস্তান্তরটি সম্পূর্ণভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘TAA/MLA’ (Technical Assistance Agreement / Manufacturing License Agreement) রপ্তানি-লাইসেন্সিং অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।
কৌশলগত সীমাবদ্ধতা:
যদিও এই প্রজেক্টটিকে একটি স্বাধীন সামরিক যোগাযোগ সক্ষমতার পথ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তবে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে যে পরিমাণ সার্বভৌমত্ব ভোগ করবে, তা মার্কিন রেগুলেটরি নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকবে। লাইসেন্সের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী এবং হস্তান্তরের পর্যায়ভিত্তিক প্রকৃতির কারণে কৌশলগত প্রযুক্তির চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের নীতিমালার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে।
প্রতিরক্ষা স্থানীয়করণের নতুন টেস্ট কেস
পরিশেষে বলা যায়, এই কর্মসূচিটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে কি না তা মূল্য, লাইসেন্সিং, রাজনৈতিক অনুমোদন এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী শিল্প অংশীদারিত্বের প্রতি সেনাবাহিনীর প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করবে।
তবে এল৩হেরিসের এই জমা দেওয়া প্রস্তাবটি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়: ২০২৫ সালের শেষের দিকে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মের অভ্যন্তরীণ অ্যাসেম্বলির দিকে একটি সুগঠিত পথ অন্বেষণ করছিল, যেখানে প্রতিরক্ষা খাতের একটি শীর্ষ মার্কিন প্রতিষ্ঠান নিজেকে সেই রূপান্তরের কেন্দ্রে অবস্থান করাচ্ছে।
