রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে ১১ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ ও হাসপাতালের পরিচালকের ওপর দায় চাপানো নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকটে ১১ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। জীবন বাঁচানোর শেষ সম্বল এই চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে এতগুলো শিশুর প্রাণহানি দেশের স্বাস্থ্য খাতের কঙ্কালসার অবস্থাকেই জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা এবং তদারকি নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মর্মান্তিক সেই মুহূর্ত: যখন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে গুরুতর অসুস্থ এসব শিশুদের আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু দীর্ঘ চেষ্টার পরও ভেন্টিলেটর খালি না থাকায় বা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম না থাকায় চিকিৎসকরা তাদের জীবন রক্ষা করতে পারেননি।
স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে রামেক হাসপাতালের বাতাস।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, সময়মতো উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলে হয়তো তাদের সন্তানদের অকাল মৃত্যু হতো না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ: দায় কি কেবল পরিচালকের?
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বক্তব্যে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পরিচালকের “ফাঁসি হওয়া উচিত”। মন্ত্রীর দাবি, হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের সংকট বা অভাবের বিষয়টি কেন তাকে সময়মতো অবহিত করা হয়নি?
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল হাসপাতালের পরিচালকের ওপর দায় চাপিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার নিজের ‘অথর্ব’ তদারকি ব্যবস্থা আড়াল করতে পারে না।
দেশের একটি অন্যতম প্রধান হাসপাতালে এমন সংকট কেন আগে থেকে মন্ত্রনালয়ের নজরে এল না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
তদারকির অভাব না কি সমন্বয়হীনতা?
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মতো বড় একটি হাসপাতালে যখন এমন মানবিক বিপর্যয় ঘটে, তখন তা কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা থাকে না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকির অভাব এখানে স্পষ্ট। মন্ত্রীর ‘ফাঁসি’ চাওয়ার মতো কঠোর মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করলেও, তা মৃত শিশুদের পরিবারের ক্ষত কতটুকু উপশম করবে—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিএনপি সরকারের ‘অথর্ব’ স্বাস্থ্য প্রশাসন?
বর্তমান সরকারের অধীনে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বর্তমান মন্ত্রণালয়কে ‘অথর্ব’ হিসেবে প্রমাণ করছে বলে অনেকের অভিমত। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রশাসনিক রদবদলের ডামাডোলে সাধারণ মানুষের জীবনরক্ষার সরঞ্জামগুলো কেন অবহেলিত থাকছে, তা এখন সময়ের দাবি।
দায়বদ্ধতা ও বিচারিক দাবি
১১টি প্রাণের বিনিময়ে কেবল মৌখিক ক্ষোভ প্রকাশ কোনো সমাধান নয়।
বিশেষজ্ঞারা মনে করেন, এর জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত।
যদি পরিচালক দোষী হন তবে তার বিচার হবে, কিন্তু একই সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
কেন জেলা পর্যায়ে ভেন্টিলেটরের ব্যাক-আপ পরিকল্পনা ছিল না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকার কারণে মৃত্যু হওয়া স্পষ্টতই মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
দেশের করদাতা নাগরিকরা চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
যখন একটি রাষ্ট্র ও তার সরকার জনগণের জীবন রক্ষায় ন্যূনতম সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে পারে না, তখন সেই প্রশাসনের বৈধতা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন ওঠে।
কান্না থামবে কবে?
রাজশাহীর এই ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক বিশৃঙ্খলার একটি অংশ।
১১ জন মায়ের কোল খালি হওয়ার দায়ভার এড়ানোর সুযোগ সরকারের নেই।
কেবল পরিচালকের ফাঁসি চাওয়া বা কর্মকর্তাদের ধমক দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি পারবে এই ‘অথর্ব’ তকমা ঘুচিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে পেতে?
উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায়।
