বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পাকিস্তানি কোম্পানির রহস্যজনক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম চুক্তি। ঢাকার নাফিসা এন্টারপ্রাইজের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদভিত্তিক শিবলির সাথে গোপন তৎপরতা।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে এক নতুন এবং রহস্যময় সমীকরণের উদ্ভব হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরণের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেলেও, পর্দার আড়ালে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিশেষ করে, ঢাকার একটি সাধারণ ‘টেক্সটাইল ডাই’ বা বস্ত্রশিল্পের রং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান থেকে স্পর্শকাতর সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু হওয়াতে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব: পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের গোপন আস্তানা
গত ২৯ মার্চ সিলেট জালালাবাদ সেনানিবাসের স্কুল অফ ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকস (SI&T) এবং সেনাবাহিনীর মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে একটি উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
চার সদস্যের এই দলে ছিলেন সৈয়দ মুহাম্মদ আয়াজ, মুহাম্মদ মুনাম নাসির, নুমান বাট এবং মুহাম্মদ আসাদ জামান।
নর্থইস্ট নিউজ-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে,
জেনারেল স্টাফ ব্রাঞ্চের বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিয়ে তারা ঢাকায় আসেন এবং কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে অবস্থান করেন।
আশ্চর্যজনকভাবে,
এই পাকিস্তানি প্রতিনিধিরা চলে যাওয়ার আগেই একই গেস্ট হাউসে তিনজন তুর্কি নারী নাগরিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যারা প্রতিরক্ষা বা কৌশলগত কোনো মিশনে যুক্ত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অস্ত্রের মাপজোখ ও সাইট মাউন্ট: কেন এই বিশেষ তৎপরতা?
পাকিস্তানি কোম্পানি ‘শিবলি ইলেকট্রনিক্স’ (SHIBLI) উৎপাদিত বিশেষ নজরদারি সরঞ্জাম বা ‘সাইট’ (Sights)-এর জন্য কাস্টমাইজড মাউন্ট তৈরি করতেই এই প্রতিনিধি দলটি ঢাকা ও সিলেট সফর করে।
সেনাবাহিনীর ইনফ্যান্ট্রি ডিরেক্টরেটের সাথে তাদের নিবিড় সমন্বয়ের খবর পাওয়া গেছে।
এসআইঅ্যান্ডটি-তে সরাসরি অস্ত্রের মাপজোখ নেওয়া এবং কারিগরি ফিডব্যাক আদান-প্রদান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে,
পাকিস্তান থেকে বড় ধরণের ইনফ্যান্ট্রি সরঞ্জাম ক্রয়ের চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।
নাফিসা এন্টারপ্রাইজ: টেক্সটাইল ডাই থেকে প্রতিরক্ষা দালালি?
এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছে ঢাকার ‘নাফিসা এন্টারপ্রাইজ’।
২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসা হলো টেক্সটাইল কেমিক্যাল, রং এবং ল্যাবরেটরি সার্ভিস।
তবে হারুন-অর-রশীদের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য ‘বিশেষায়িত পণ্য’ আমদানিকারক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি—
অর্থাৎ ভোটের মাত্র ১০ দিন পরেই—নাফিসা এন্টারপ্রাইজ এবং ইসলামাবাদভিত্তিক শিবলি ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়।
একটি সিভিল সেক্টরের ডাইস ও কেমিক্যাল কোম্পানি কীভাবে হঠাৎ করে স্পর্শকাতর সামরিক সরঞ্জাম (যেমন অ্যান্টি-ড্রোন সলিউশন বা কমব্যাট অপট্রোনিক্স) সরবরাহের লাইসেন্স পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিবলি ইলেকট্রনিক্স: ইসলামাবাদের ছায়া সঙ্গী
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানভিত্তিক শিবলি ইলেকট্রনিক্স মূলত নিরাপত্তা ও নজরদারি সরঞ্জাম নকশা করে।
এর প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মুহাম্মদ শিবলি এবং তার দুই ছেলে বর্তমানে কোম্পানিটি পরিচালনা করছেন।
তাদের পণ্যের তালিকায় হ্যান্ডহেল্ড নজরদারি সরঞ্জাম থেকে শুরু করে বর্ডার সিকিউরিটি সিস্টেম পর্যন্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সাথে তাদের এই হঠাৎ ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যমান নিরাপত্তা সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
কূটনৈতিক সমীকরণ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দাবি করলেও তারেক রহমান সরকারের অধীনে সামরিক বাহিনীর পাকিস্তান ও তুরস্কমুখী এই অবস্থানকে ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ না কি ‘পুরনো মিত্রের দিকে ঝোঁকা’—তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া এবং সামরিক স্থাপনায় সরাসরি পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার দেওয়া—নিরাপত্তার খাতিরে কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
অস্বচ্ছতার আড়ালে প্রতিরক্ষা খাত
প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু নাফিসা এন্টারপ্রাইজের মতো একটি কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাকিস্তানি কোম্পানি শিবলির সাথে এই আঁতাত অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ডিজিডিপি (DGDP) বা বিওএফ (BOF)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স থাকলেও সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সামরিক গোপনীয়তা কতটুকু সুরক্ষিত থাকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
