দেড় মাসে ৪১ হাজার কোটি ব্যাংক ঋণ নিয়েছে সরকার। রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপে বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি।
স্বল্প সময়ে বিপুল ঋণ, বাড়ছে উদ্বেগ
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক এই ঋণগ্রহণের ধারা অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্প সময়ে এত বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ ভবিষ্যতে আর্থিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) মোট ঋণ গ্রহণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
রাজস্ব ঘাটতি মূল কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির কারণেই সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় কমানোর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
৯ মাসেই ছাড়ালো লক্ষ্যমাত্রা
অর্থবছরের মাত্র ৯ মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো
অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্য অনুযায়ী,
২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে ব্যাংক ঋণ বেড়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন,
“আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ঋণ ফাঁদে না পড়া। রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে, নইলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, সরকারকে আয় বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
ব্যবসায়ী নেতারাও সরকারের ঋণনির্ভরতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন,
“ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে তা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ঋণ পরিশোধে সরকারই সংকটে পড়তে পারে।”
অন্যদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, ব্যাংকিং খাতে ইতোমধ্যেই তারল্য সংকট চলছে।
প্রায় অর্ধেক ব্যাংকই মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে, ফলে নতুন করে ব্যবসায়িক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি এভাবে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে থাকে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে।
এতে বিনিয়োগ কমবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বল্প সময়ে বিপুল ঋণ গ্রহণ দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো,
ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে দেশ।
