দেড় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ কারাগারে পাঠানো হলো যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে। মানবাধিকার ও আইনি নিষ্ঠুরতা নিয়ে দেশজুড়ে বইছে বিতর্কের ঝড়।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ২১ এপ্রিল, ২০২৬;
রাজধানীর আদালত পাড়ায় আজ এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। একদিকে আইনের কঠোর শাসন, অন্যদিকে একটি দেড় মাস বয়সী নিষ্পাপ শিশুর কান্নার আওয়াজ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বিচারিক আদেশে কারাগারে পাঠানো হলো যুব মহিলা লীগ নেত্রী মোসা. শিল্পী বেগমকে। তেজগাঁও থানায় দায়ের করা হামলা ও লুটপাটের এক মামলায় অভিযুক্ত এই মায়ের কোলে ছিল মাত্র এক মাস ১৬ দিন বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য শিশু। এই ঘটনা কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়, বরং সাধারণ মানুষের বিবেক ও মানবাধিকারের প্রশ্নেও বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
গ্রেফতার ও আদালতের আদেশ: কী ঘটেছিল সেদিন?
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত সোমবার রাতে শিল্পী বেগমকে তাঁর নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ।
পরদিন মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) তাঁকে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসেন মোহাম্মদ জোনাঈদের আদালতে হাজির করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারে আটকে রাখার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এ দেশের মানুষ আজ এক নিষ্ঠুর নজির দেখলো।
একজন মাকে তাঁর দেড় মাসের শিশুসহ পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছে, যা মা ও শিশুর মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।”

মামলার প্রেক্ষাপট: অভিযোগের পাহাড়
শিল্পী বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ মূলত ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ মুবিন রাতুলের ওপর হামলা এবং পরবর্তীকালে তাঁর বাসায় ভাঙচুর ও ৫ লাখ টাকা লুটপাটের ঘটনায় শিল্পী বেগমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর মা শাহনূর খানম সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১০৩ জনের নামে যে মামলা করেছিলেন, শিল্পী বেগম সেই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত।
তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, শিল্পী বেগম আন্দোলন দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তদন্তের স্বার্থে তাঁকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন।
জেলে দুগ্ধপোষ্য শিশু: আইনি জটিলতা ও জেল কোড
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো মা গ্রেফতার হলে তাঁর সাথে থাকা কোলের শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, জেল কোড অনুযায়ী শিশুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একটি দেড় মাসের শিশু যে কেবল মায়ের বুকের দুধের ওপর নির্ভরশীল, তাকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা কি আদৌ কোনো মানবিক সরকারের পরিচয় হতে পারে?
মানবাধিকার ও জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন
শিল্পী বেগম কোনো খুনের মামলার আসামি নন, বরং একটি রাজনৈতিক ও লুটপাটের মামলার অভিযুক্ত।
এমন পরিস্থিতিতে একটি নবজাতক শিশুকে জেলের ভেতরে নিয়ে যাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
- মানবিকতা বনাম রাজনীতি: রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুর অপরাধ কী?
- মানবাধিকার লঙ্ঘন: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, শিশুর সর্বোত্তম সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জেলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কি একটি নবজাতকের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে না?
জনগণের সরকার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বর্তমান সরকারকে ‘জনগণের সরকার’ হিসেবে দাবি করা হলেও, এই ধরনের ঘটনা জনগণের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বিরোধীদের দমন করতে গিয়ে কি মানবিকতার শেষ সীমারেখাটিও মুছে যাচ্ছে? এক মাস ১৬ দিনের শিশুসহ মাকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাটি মানবাধিকারের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
“আইন অন্ধ হতে পারে, কিন্তু আইনের প্রয়োগকারী বা বিচারকদের বিবেক কি অন্ধ হতে পারে? একটি শিশুর শৈশব যদি কারাগারের শিকের আড়ালে শুরু হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।”
অমানবকিতার শেষ কোথায়?
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিল্পী বেগম দোষী না নির্দোষ তা প্রমাণিত নয়।
তবে বিচারের আগে একটি নিষ্পাপ শিশুকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উর্ধ্বে উঠে মানবিক বিবেচনায় এই মা ও শিশুর প্রতি সদয় হওয়ার জন্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দাবি জানিয়েছে।
জাতির বিবেকের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—এটাই কি সেই স্বপ্নের ‘মানবিক বাংলাদেশ’?
