বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্মে আসছে বড় পরিবর্তন। গাঢ় নীল ও খাকি রঙের সংমিশ্রণে ফিরছে সেই মান্না আমলের স্মৃতি। জানুন ২০২৫ ড্রেস রুলস ও নতুন সাজের বিস্তারিত তথ্য।

বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি ও সদস্যদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বিবেচনা করে দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান হতে যাচ্ছে। আবারও পুরনো এবং জনপ্রিয় সেই রঙের সংমিশ্রণে ফিরছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক। অনেকটা ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক মান্নার অভিনীত সেই দাপুটে পুলিশি লুক বা চিরচেনা সেই ‘কপ ইউনিফর্ম’ এর আদলেই সাজানো হচ্ছে নতুন প্রস্তাবনা। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিকস শাখা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত এক চিঠিতে এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। ‘পুলিশ ড্রেস রুলস ২০২৫’ সংশোধনের মাধ্যমে বাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে।
কেন এই পরিবর্তন? মাঠপর্যায়ের অস্বস্তি ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া
বিগত সময়ে পুলিশের ইউনিফর্মে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল (লোহার রঙের শার্ট ও কফি রঙের প্যান্ট), তা মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
সাধারণ সদস্যদের অভিযোগ ছিল, ওই রঙের পোশাক বাহিনীর ঐতিহ্যের সাথে মানানসই নয় এবং জনসাধারণের কাছে এটি সেভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং সদস্যদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন রঙের নমুনা দীর্ঘ সময় ধরে পর্যালোচনা করেন।
সেই ধারাবাহিকতায় অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সারোয়ার জাহান স্বাক্ষরিত পত্রে পোশাকের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
নতুন পোশাকে কী থাকছে? ইউনিটভিত্তিক রঙের বিন্যাস
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, পুলিশকে দুটি মূল রঙের ধারায় ভাগ করা হয়েছে। নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে নতুন রঙের বিন্যাস তুলে ধরা হলো:
| ইউনিটের নাম | শার্টের রঙ | প্যান্টের রঙ |
| সকল মেট্রোপলিটন পুলিশ | হালকা অলিভ (জলপাই রঙ) | খাকি |
| সাধারণ জেলা পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিট | গাঢ় নীল (Deep Blue) | খাকি |
| বিশেষায়িত ইউনিট (র্যাব, সিআইডি, এসবি) | বিদ্যমান বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী | বিদ্যমান বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী |
এই পরিবর্তনের মাধ্যমে জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের মধ্যে একটি দৃশ্যমান পার্থক্য রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চিনতে আরও সহজ করে তুলবে।
অর্থনৈতিক দিক: সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা নেই
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, বারবার পোশাক পরিবর্তনে সরকারি কোষাগারের অর্থ অপচয় হবে কি না। তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই পরিবর্তনের ফলে সরকারের উপর বাড়তি কোনো আর্থিক চাপ পড়বে না। ইউনিফর্ম সরবরাহের বার্ষিক বরাদ্দ বা নিয়মিত বাজেটের মধ্যেই এই সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ, পূর্বের বরাদ্দকৃত অর্থেই নতুন রঙের পোশাক তৈরি ও বিতরণ করা সম্ভব হবে।
নায়ক মান্নার সেই দাপুটে ইমেজ ও জনস্মৃতি
বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘পুলিশ’ মানেই যেন এক সময়কার জনপ্রিয় চিত্রনায়ক মান্নার সেই গাঢ় নীল কিংবা জলপাই রঙের পোশাকের তেজস্বী রূপ। দীর্ঘকাল ধরে এই রঙের পোশাকটি পুলিশের আইকনিক পরিচয় হিসেবে কাজ করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, পুরনো রঙে ফিরে যাওয়া পুলিশের প্রতি জনমানুষের আস্থার একটি মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র তৈরি করবে। বাহিনীর ভেতরেও এক ধরনের পেশাদারিত্ব ও ঐতিহ্যের গর্ব ফিরে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ড্রেস রুলস ২০২৫: কী আছে সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে?
পুলিশ ড্রেস রুলস ১৯৫০-এর পর বিভিন্ন সময় পরিবর্তন এলেও ‘২০২৫-এর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন’ বাহিনীর আধুনিকায়নের একটি বড় ধাপ। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পূর্বে নির্ধারিত গাঢ় ধূসর শার্ট এবং গাঢ় নীল প্যান্টের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রস্তাবনা দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
প্রস্তাবনার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- জলবায়ু সহনশীল কাপড়: পোশাকের রঙ পরিবর্তনের পাশাপাশি কাপড়ের মান এবং আরামদায়কতার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- দৃশ্যমান পার্থক্য: মেট্রোপলিটন ও জেলা পুলিশের পোশাকে ভিন্নতা আনা হয়েছে যাতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
- স্মার্ট লুক: নতুন প্যান্টের রঙ ‘খাকি’ রাখার মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক ও ক্ল্যাসিক পুলিশি রূপ বজায় রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও পরবর্তী ধাপ
পুলিশের লজিস্টিকস শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনের খসড়া প্রজ্ঞাপন এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন এবং প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরপরই নতুন পোশাক তৈরির কাজ শুরু হবে। এটি ধাপে ধাপে সারা দেশের সকল পুলিশ সদস্যের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের পোশাক শুধু একটি ইউনিফর্ম নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আস্থার প্রতীক।
তাই পোশাক নির্বাচনে সদস্যদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং জনমানুষের মনস্তত্ত্বকে গুরুত্ব দেওয়া একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ পুলিশের এই সংস্কার পদক্ষেপে বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা হবে বলে বিশ্বাস করা হচ্ছে। ‘লোহার রঙ’ আর ‘কফি রঙ’ এর জগাখিচুড়ি অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সুনির্দিষ্ট ও মার্জিত রঙের এই প্রত্যাবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সবাই। এখন শুধু প্রজ্ঞাপন জারি এবং রাজপথে নতুন সাজে সজ্জিত পুলিশ সদস্যদের দেখার অপেক্ষা।
