জাতীয় সংসদে নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করলেন জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও বিস্তারিত পড়ুন এখানে।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এবং কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার এই বক্তব্য সংসদ সদস্যসহ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
‘রাজাকার-আলবদর এখন মৃত ইস্যু’
বক্তব্যের শুরুতে ডা. তাহের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অতীত ইতিহাস টেনে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির সংস্কৃতির সমালোচনা করেন।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, একাত্তরের ঘাতক-দালাল বা রাজাকার-আলবদর সংক্রান্ত বিতর্ক বর্তমান সময়ে গুরুত্বহীন।
তার মতে, এটি এখন একটি ‘ডেড ইস্যু’ বা মৃত বিষয়।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “বর্তমানে যারা জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বসে আছি, আমাদের মধ্যে কেউই রাজাকার বা আলবদর বাহিনীর সাথে যুক্ত ছিলাম না।
তাই এই পুরোনো তকমা দিয়ে বিভাজন তৈরির সুযোগ নেই।”
কেন তিনি নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেন?
ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কেবল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেই ক্ষান্ত হননি, বরং একাত্তরে নিজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে নতুন একটি তকমা সামনে এনেছেন।
তিনি বলেন, “যদি মুক্তিযুদ্ধের অবদানের প্রসঙ্গ ওঠে, তবে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমিও একজন শিশু মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম।”
তার এই দাবির স্বপক্ষে তিনি যুদ্ধের দিনগুলোর কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
তিনি জানান, ১৯৭১ সালে তার বাড়িটি ছিল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায়।
সেই উত্তাল সময়ে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ভারতের দিকে পাড়ি দিচ্ছিল।
ডা. তাহেরের পরিবার সেই শরণার্থীদের আশ্রয় ও সহায়তা প্রদান করত।
শরণার্থীদের সীমান্ত পারাপারে ভূমিকা
ডা. তাহের তার বক্তব্যে সেই সময়ের একটি রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির বর্ণনা দেন।
তিনি বলেন, “যুদ্ধ চলাকালীন ভারতগামী অসহায় শরণার্থীরা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন।
তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কড়া টহল থাকত।
আমরা ছোটরা বিশেষ নজর রাখতাম সেনাবাহিনীর গতিবিধির ওপর।
সেনারা কখন টহল শেষ করে চলে যাচ্ছে বা কখন এলাকা নিরাপদ থাকছে—সেই তথ্য আমরা শরণার্থীদের জানাতাম। সুযোগ বুঝে তাদের সীমান্ত পার হতে সাহায্য করতাম।”
তিনি মনে করেন, সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ না নিলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শরণার্থীদের পথ দেখানো এবং তথ্য সরবরাহ করা একজন মুক্তিযোদ্ধারই কাজ।
এই প্রেক্ষাপট থেকেই তিনি নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দেন।
“আমরা যারা এখানে বসে আছি, কেউই রাজাকার বা আলবদর ছিলাম না। যুদ্ধের সময় পরিস্থিতির প্রয়োজনে আমরা যেটুকু পেরেছি দেশের মানুষের জন্য করেছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই বক্তব্য
ডা. তাহেরের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেখছেন।
কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ওপর দীর্ঘকাল ধরে যে ‘যুদ্ধাপরাধী’ তকমা রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার এটি একটি কৌশল।
আবার অনেকে মনে করেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণের যে ভিন্ন ভিন্ন স্তরের অবদান ছিল, ডা. তাহেরের বক্তব্যে তারই একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
জামায়াতের অবস্থানের পরিবর্তন?
দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে রক্ষণশীল অবস্থান দেখা গেলেও,
সাম্প্রতিক সময়ে দলটির নেতাদের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বা নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে।
ডা. তাহেরের এই বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই অংশ কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
শিশু মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও মানদণ্ড রয়েছে।
যদিও ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে আলাদা কোনো গেজেট বা তালিকা নেই, তবে যুদ্ধের সময় কিশোর বা শিশুদের সাহসী ভূমিকা অনেক ঐতিহাসিক দলিলে স্বীকৃত।
ডা. তাহেরের এই ব্যক্তিগত দাবি কি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আবেদন, নাকি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সংসদের উত্তাপ ও প্রতিক্রিয়া
ডা. তাহের যখন এই দাবি করছিলেন, তখন সংসদে উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শোনা যায়।
তবে তিনি তার বক্তব্যে অনড় থেকে যুক্তি দেখান যে, স্বাধীনতার ৫ দশক পর এখন সময় এসেছে নতুন করে দেশ গড়ার, পুরোনো বিতর্ক আঁকড়ে ধরে থাকার নয়।
ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের এই বক্তব্য বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
একজন জামায়াত নেতার মুখে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দের প্রয়োগ এবং নিজের শৈশবকে সেই ইতিহাসের অংশ হিসেবে দাবি করাটা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
তার এই দাবি সাধারণ মানুষের মনে কেমন প্রভাব ফেলে এবং রাজনৈতিক দলগুলো একে কীভাবে গ্রহণ করে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
