ভারতের মেঘালয়ে ১১টি দেশের অংশগ্রহণে শুরু হচ্ছে ১৩ দিনব্যাপী সামরিক মহড়া ‘প্রগতী’। তবে প্রতিবেশী বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ায় দানা বাঁধছে নানা প্রশ্ন। বিস্তারিত পড়ুন রিপোর্টে।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারতের আসন্ন বহুপাক্ষিক সামরিক মহড়া ‘প্রগতী’। আগামী ১৮ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মেঘালয়ের উমরোহিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ১৩ দিনব্যাপী সামরিক আয়োজনে আমন্ত্রণ পেয়েছে ১১টি দেশ। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার বাংলাদেশ এই তালিকায় স্থান পায়নি। নয়াদিল্লির এই তৎপরতা কি কেবলই সামরিক মহড়া, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর কূটনৈতিক সমীকরণ? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের টেবিলে।
‘প্রগতী’ মহড়া: লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত জনসংযোগ পরিদপ্তর (ADGPI) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানিয়েছে,
এই মহড়ার প্রধান লক্ষ্য হলো সন্ত্রাসবাদ দমন, বিদ্রোহ দমন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুসংহত করা।
ভারত চাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে একটি সমন্বিত অপারেশনাল কাঠামো (Operational Framework) গড়ে তুলতে।
এই মহড়ার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
সক্ষমতা বৃদ্ধি: অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সেনাবাহিনীর মধ্যে পেশাদার দক্ষতা বিনিময়।
প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী: মহড়ার ফাঁকে দুই দিনের একটি সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে ভারত নিজের তৈরি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে তুলে ধরবে।
কৌশলগত সংহতি: আঞ্চলিক অস্থিরতা মোকাবিলায় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানো।
আমন্ত্রিত ১১ দেশ: কারা থাকছে এই তালিকায়?
ভারতের মেঘালয়ের উমরোহিতে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রেনিং সেন্টার’-এ সমবেত হবে ১১টি দেশের সশস্ত্র বাহিনী। দেশগুলো হলো:
১. লাওস, ২. মিয়ানমার, ৩. সিসিলি, ৪. শ্রীলঙ্কা, ৫. ফিলিপাইন, ৬. নেপাল, ৭. মালদ্বীপ, ৮. মালয়েশিয়া, ৯. ভিয়েতনাম, ১০. কম্বোডিয়া, ১১. ভুটান।
তালিকায় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (ASEAN) এবং দক্ষিণ এশিয়ার (SAARC) দেশগুলোর একটি মিশ্রণ এখানে ঘটানো হয়েছে।
বিশেষ করে মিয়ানমার এবং মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর উপস্থিতি ভারতের কৌশলগত নমনীয়তার পরিচয় দেয়।
কেন নেই বাংলাদেশ? উদ্বেগের না কি কৌশলের অংশ?
বাংলাদেশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে এই মহড়া আয়োজনের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসি এবং ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় বাংলাদেশ থাকে।
তবে ‘প্রগতী’ থেকে ঢাকার অনুপস্থিতি নিয়ে দুটি ভিন্ন মত পাওয়া যাচ্ছে:
১. বিশেষায়িত কৌশল: অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি হয়তো নির্দিষ্ট কিছু দেশের জন্য নকশা করা একটি মহড়া, যেখানে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রয়োজন বোধ করেনি ভারত।
২. কূটনৈতিক সংকেত: সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে ভারতের এই সিদ্ধান্ত কি কোনো বিশেষ বার্তা বহন করছে?
যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, এটি কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করার প্রয়াস, কিন্তু ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীকে বাদ রাখা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রচার ও ‘প্রগতী’
ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত হতে চাইছে।
‘প্রগতী’ মহড়ার সমান্তরালে আয়োজিত প্রতিরক্ষা শিল্প প্রদর্শনীটি সেই লক্ষ্যেই সাজানো।
সেখানে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগযুক্ত সামরিক যান, ড্রোন এবং নজরদারি সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হবে।
অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে ভারতের তৈরি সামরিক পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করাই নয়াদিল্লির অন্যতম বাণিজ্যিক লক্ষ্য।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব ও বিশেষজ্ঞদের মত
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রগতী’ কেবল একটি মহড়া নয়, এটি চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে ভারতের একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি ব্লক তৈরি করতে চাইছে ভারত, যাতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা যায়।
তবে বাংলাদেশকে এই বলয়ের বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগের অবকাশ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঢাকা-দিল্লি সামরিক সম্পর্ক সবসময়ই মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে।
১৮ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ১৩ দিনের মহড়া ভারতের সামরিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতার এক বড় পরীক্ষা।
মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক ঝালাই করার সুযোগ পেলেও, বাংলাদেশের অনুপস্থিতি এই আয়োজনের পূর্ণতাকে কিছুটা হলেও ম্লান করেছে বলে মনে করেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে ভারত এই ‘গ্যাপ’ পূরণ করতে নতুন কোনো উদ্যোগ নেয় কিনা।
