শেরপুরের ৫০টি গ্রামে টানা চার দিন বিদ্যুৎ নেই। কালবৈশাখীর পর স্থবির জনজীবন। দায়বদ্ধতাহীন প্রশাসন ও বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে উঠছে তীব্র প্রশ্ন।
সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরের আকাশ এখন কালবৈশাখীর মেঘে ঢাকা থাকলেও, মাটির নিচের জনপদ ঢাকা পড়ে আছে এক গভীর ও অন্ধকার হতাশায়। জেলার শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৫০টি গ্রামে টানা চার দিন ধরে নেই বিদ্যুৎ। ঘড়ির কাঁটা ৯৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পল্লী বিদ্যুতের কোনো কর্মীর দেখা মেলেনি ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের জন্য। একদিকে অসহ্য গরম, অন্যদিকে আধুনিক জীবনের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তবে এই অন্ধকারের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বর্তমান প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও জবাবদিহিহীনতা।
বিপর্যস্ত জনজীবন: সুমনের পড়াশোনা আর সোহেলের হাহাকার
শেরপুরের এই গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকা মানে কেবল ফ্যান বন্ধ থাকা নয়, বরং জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়া।
এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমন মিয়া অন্ধকারে বই নিয়ে বসে থাকলেও পড়ার কোনো উপায় নেই। তার ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত।
অন্যদিকে শ্রীবরদীর সোহেল বা ঝিনাইগাতীর আতিক আকন্দের মতো সাধারণ মানুষরা বলছেন,
গত চার দিনে তারা না পেরেছেন মোবাইল চার্জ দিতে, না পেরেছেন একটু শান্তিতে ঘুমাতে।
পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজারের ভাষ্যমতে, “কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, এটা সত্যি”—এমন দায়সারা মন্তব্য যেন ক্ষতে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
শেরপুরের এই বিদ্যুৎ সংকটকে বিশ্লেষকরা কেবল একটি কারিগরি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না।
এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক কারণ। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেছে।
সেই নির্বাচনে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি এবং সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতিও ছিল নগণ্য।
যখন একটি সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয় না, তখন সেই সরকারের কর্মকাণ্ডে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন ঘটে না।
শেরপুরের অন্ধকার গ্রামগুলো আজ সেই ‘ভোটহীন’ শাসনেরই নির্মম সাক্ষী।
জনবিচ্ছিন্ন মন্ত্রিসভা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন
ঢাকায় বসে মন্ত্রীরা যখন নীতি-নির্ধারণী বৈঠক করছেন, তখন শেরপুরের সাধারণ মানুষের আর্তনাদ তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না।
স্বাভাবিক সময়েই এসব এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং চলে।
অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না।
কালবৈশাখীর ঝড়ে সঞ্চালন লাইন ছিঁড়ে যাওয়ার পর মেরামত না হওয়া প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি নেই।
এটি একটি ‘প্রহসনমূলক’ মন্ত্রিসভার বাস্তব রূপ, যেখানে মন্ত্রীদের নাম থাকলেও কাজের কোনো প্রতিফলন নেই।
ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার: সেনানিবাস থেকে ক্ষমতা দখল
বিএনপির রাজনৈতিক জন্মপ্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলে থাকেন যে, এই দলের সৃষ্টি রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নয়, বরং সেনানিবাসে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে।
সেই শুরু থেকেই দলটির সাথে জনগণের সম্পর্ক অনেকটা ‘উপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া’। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গণরায়ের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার মসনদে বসার পর জনগণের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার চেয়ে ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করাকেই তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
শেরপুরের ৫০টি গ্রামের অন্ধকার যেন সেই প্রাচীন স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতারই এক আধুনিক প্রকাশ।
অন্ধকারের ওপারে কী?
শেরপুরের মানুষ আজ কেবল বিদ্যুৎ নয়, বরং তাদের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পাওয়ার লড়াই করছে।
একটি দেশের শিক্ষা (এসএসসি পরীক্ষা), যোগাযোগ এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যখন দিনের পর দিন ব্যাহত হয় এবং রাষ্ট্র নির্বিকার থাকে, তখন সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।
জনগণের ভোটে না আসা সরকার জনগণের কথা শুনবে কেন—এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি শেরপুরবাসীর মুখে।
অন্ধকার কাটবে হয়তো একসময়, কিন্তু এই ৯৫ ঘণ্টার অবর্ণনীয় কষ্ট এবং প্রশাসনের অবজ্ঞা সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে, তা ভবিষ্যতে কোনো বড় পরিবর্তনের বার্তা কি না—সময়ই তা বলে দেবে।
