ময়মনসিংহের গোপালনগর কমিউনিটি ক্লিনিকে তীব্র ওষুধ সংকট ও বেতন বকেয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী না পেয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় নারীরা। বিস্তারিত পড়ুন।
গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল কমিউনিটি ক্লিনিক। কিন্তু ময়মনসিংহের সদর উপজেলার গোপালনগর গ্রামের দৃশ্যপট এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে পাওয়ার কথা ছিল বিনামূল্যে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা, সেখানে এখন মিলছে কেবল একরাশ হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। গত কয়েক মাস ধরে এই ক্লিনিকে ওষুধের তীব্র সংকট সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুখী ট্যাবলেট নেই, হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় স্যালাইন
গোপালনগর গ্রামের গৃহবধূ লিমা খাতুন (৩৫)। সম্প্রতি অসুস্থতা নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় এই ক্লিনিকে। বুকভরা আশা ছিল বিনামূল্যে অন্তত কিছু ওষুধ মিলবে।
কিন্তু ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার চোখেমুখে ছিল কেবল ক্ষোভ আর বিরক্তি।
লিমা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন,
“ডাক্তারের দেখা পাওয়াই তো দায়, আর দেখা মিললেও ওষুধ নেই। অসুস্থ শরীর নিয়ে গেলে কেবল ওরস্যালাইন আর কয়েকটা আয়রন ট্যাবলেট দিয়ে বিদায় করে দেয়। একটা সরকারি ক্লিনিক যদি শুধু স্যালাইন দেওয়ার জন্য হয়, তবে সাধারণ মানুষের লাভ কী?”
একই সুর শোনা গেল ফাতেমা আক্তারের কণ্ঠে। তিনি এসেছিলেন পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী নিতে। কিন্তু সেখানেও শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে তাকে।
ফাতেমা বলেন, “আগে এখান থেকেই আমরা সুখী ট্যাবলেট, কনডম বা প্রয়োজনীয় ইনজেকশন পেতাম। এখন গেলে বলে ওষুধ নেই, দোকান থেকে কিনে নিতে।
আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে বারবার বাইরে থেকে ওষুধ কেনা কি সম্ভব?”
২০২৫-এর আগস্ট থেকে থমকে আছে সরবরাহ
ক্লিনিক সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই অচলাবস্থার শুরু মূলত ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে।
আগে যেখানে নিয়মিতভাবে প্রায় ২২ ধরনের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করা হতো, এখন সেখানে ওষুধের আলমারিগুলো প্রায় শূন্য।
বর্তমানে সীমিত পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, কিছু সাধারণ মলম আর ওরস্যালাইন ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
ফলে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। গ্রামের নিম্নবিত্ত মানুষ, যারা পুরোপুরি এই সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তারা এখন বিপাকে পড়েছেন।
ট্রাস্টের কবলে স্থবির স্বাস্থ্যসেবা?
ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখন ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর থেকেই মূলত সমস্যার সূত্রপাত।
সিভিল সার্জন জানান,
“কেন্দ্রীয়ভাবে ওষুধ সরবরাহ প্রক্রিয়া এখন ট্রাস্টের মাধ্যমে হচ্ছে। আমরা নিয়মিত চাহিদা পাঠালেও ওপর থেকে ওষুধ আসছে না। ফলে মাঠ পর্যায়ে সংকট তৈরি হয়েছে।”
কেবল ওষুধ সংকট নয়, এই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে ক্লিনিকের কর্মীদের জীবনেও। জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা কোনো বেতন পাচ্ছেন না।
একদিকে ওষুধের অভাব, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই দুই মিলিয়ে গোপালনগর কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
| বর্তমান ও পূর্বের সেবার তুলনামূলক চিত্র | আগে (২০২৫-এর আগে) | বর্তমানে (২০২৬) |
| ওষুধের সংখ্যা | ২২ ধরনের ওষুধ | ৩-৪টি সাধারণ আইটেম |
| পরিবার পরিকল্পনা সেবা | নিয়মিত সরবরাহ | প্রায় বন্ধ |
| কর্মী উপস্থিতি | নিয়মিত | অনিয়মিত (বেতন সংকটে) |
| জনভোগান্তি | কম | অত্যন্ত বেশি |
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও স্থানীয়দের দাবি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে মা ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ভূমিকা অপরিসীম।
এখান থেকে পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
গোপালনগর গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, দ্রুত এই ক্লিনিকগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।
ট্রাস্ট বা প্রশাসনিক জটিলতা যেন সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।
ময়মনসিংহের গোপালনগর কমিউনিটি ক্লিনিকের এই চিত্রটি বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক রুগ্ন প্রতিচ্ছবি।
ওষুধের বদলে কেবল সান্ত্বনা আর স্যালাইন দিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ মেটানো সম্ভব নয়।
সরকারি বরাদ্দের সঠিক বণ্টন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে এনে দ্রুত এই সংকট সমাধান করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ স্লোগানটি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
