ভোলার চরফ্যাশনে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এনসিপির এক নেতার বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে প্রতিবেদনটি পড়ুন।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ভোলার চরফ্যাশনে ঘটেছে এক মর্মান্তিক ও অমানবিক ঘটনা। সাত বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় গোটা এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম সেলিম খন্দকার (৫৫)। তিনি শুধু একজন সাধারণ মানুষ নন, বরং তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (এনসিপি) বরিশাল বিভাগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাদাত খন্দকার মঞ্জুর বাবা। এই ঘটনায় শশীভূষণ থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। একদিকে একজন রাজনৈতিক নেতার পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে একটি কোমলমতি শিশুর উপর পাশবিক নির্যাতন—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত, আইনি প্রক্রিয়া, অভিযুক্ত ও তার পরিবারের বক্তব্য, এবং এ ধরনের সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সচেতনতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ঘটনার নেপথ্য ও প্রাথমিক বিবরণ
গত ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ থানার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে এই ঘটনাটি ঘটে।
ওই এলাকায় রয়েছে অভিযুক্ত সেলিম খন্দকারের একটি একতলা ভবন।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও এলাকার শিশুরা এবং পাড়ার অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে সাত বছর বয়সী ওই স্কুলছাত্রী ভবনের আশপাশে খেলাধুলা করছিল।
শিশুদের স্বাভাবিক কোলাহল ও হাসিখুশিতে মুখরিত ছিল চারপাশ।
তবে সেই স্বাভাবিকতাকে ম্লান করে দেয় এক অশুভ উদ্দেশ্য।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য এবং মামলার এজাহার অনুযায়ী,
অভিযুক্ত সেলিম খন্দকার ওই সময় শিশুদের দিকে এগিয়ে যান এবং সাত বছর বয়সী শিশুটিকে বিভিন্ন লোভনীয় খাবারের পাশাপাশি টাকার প্রলোভন দেখান।
শিশুদের মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী, খাবারের প্রতি তাদের স্বাভাবিক দুর্বলতা থাকে।
এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সেলিম খন্দকার ওই শিশুকে ফুসলিয়ে তার একতলা ভবনের ভেতরে একটি নির্জন কক্ষে নিয়ে যান।
কক্ষে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে শিশুটিকে কুপ্রস্তাব দেওয়া হয়। অবুঝ ও শিশু বয়সের কারণে শিশুটি সেই কুপ্রস্তাবের মানে বুঝতে পারেনি।
যখন সে আপত্তি জানায় এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে, তখন অভিযুক্ত সেলিম খন্দকার তার মুখ চেপে ধরেন এবং জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করেন।
এই ঘটনায় শিশুটি মারাত্মকভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
কীভাবে ঘটনাটি পরিবারের নজরে আসে
ধর্ষণের মতো একটি জঘন্য ঘটনা ঘটিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটিকে ছেড়ে দেন। ঘটনার পর শিশুটি কোনোমতে নিজের বাড়িতে ফিরে যায়।
কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার কারণে সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছিল না। বাড়িতে আসার পর থেকেই সে অবিরত কাঁদতে থাকে এবং তার কান্নার শব্দে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
পরিবারের লোকজন শিশুটির কান্নার কারণ জানতে চাইলে সে প্রথমে ভয়ে কিছু বলতে পারছিল না।
পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদের অভয়ে এবং ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর সে পুরো ঘটনাটি খুলে বলে।
শিশুটি জানায় যে, সেলিম খন্দকার তাকে খাবারের ও টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ঘরে নিয়ে গিয়ে এই খারাপ কাজটি করেছে।
ঘটনার কথা জানার পর শিশুটির পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং তারা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
এরপর তারা কালক্ষেপণ না করে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
শশীভূষণ থানায় মামলা ও পুলিশের পদক্ষেপ
পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ৩০ এপ্রিল শশীভূষণ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ বা এজাহার দায়ের করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশ প্রশাসন সক্রিয় হয়ে ওঠে।
শশীভূষণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে অভিযুক্ত সেলিম খন্দকারকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।
পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে হাজারীগঞ্জ এলাকা থেকে সেলিম খন্দকারকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ও পুলিশের কাছে সেলিম খন্দকার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মামলাটি দায়ের হওয়ার পর পুলিশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী আসামির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
গত ২ মে, শনিবার অভিযুক্ত সেলিম খন্দকারকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতের বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
শশীভূষণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফিরোজ আহমেদ গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হবে।
এনসিপি নেতার বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অভিযুক্ত সেলিম খন্দকার হলেন এনসিপির বরিশাল বিভাগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাদাত খন্দকার মঞ্জুর বাবা।
স্বভাবতই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাবার বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অভিযোগ ওঠায় রাজনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন শাহাদাত খন্দকার মঞ্জু।
তিনি দাবি করেছেন যে, সম্পূর্ণ পারিবারিক বিরোধ ও শত্রুতার জেরে তার বাবার বিরুদ্ধে এই ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তার মতে, একটি মহল তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং পারিবারিক কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে এই মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়েছে।
তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আসামি নিজেই তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন।
ফলে রাজনৈতিক দাবির চেয়ে আইনি প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং বিচার প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আইন রয়েছে। এই আইনের আওতায় ধর্ষণের মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
অভিযুক্ত সেলিম খন্দকারের বয়স ৫৫ বছর এবং তিনি যে অপরাধটি করেছেন, তা শিশু সুরক্ষার পরিপন্থী।
আইনজীবীদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি সাত বছরের শিশুর মতো অপ্রাপ্তবয়স্ক কারো ওপর যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণ করেন,
তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) অনুযায়ী তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এই মামলার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
যেহেতু আসামি নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, তাই আদালতে তা প্রমাণ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট এবং মেডিক্যাল টেস্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভুক্তভোগী শিশুর বয়স অনেক কম হওয়ায় তার শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসনও অত্যন্ত জরুরি।
সামাজিক অবক্ষয় ও শিশু সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা
এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের গভীর একটি ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ।
একজন ৫৫ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তির দ্বারা সাত বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক।
এটি প্রমাণ করে যে, সমাজে নৈতিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আমাদের দেশে প্রায়শই শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়।
এর পেছনে কাজ করে সামাজিক অসচেতনতা, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি না হওয়া।
শিশু সুরক্ষার জন্য পরিবারের ভূমিকা সবার আগে। শিশুদের একা খেলতে দেওয়া বা অপরিচিত কারো সংস্পর্শে আসার বিষয়ে মা-বাবা এবং অভিভাবকদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে যে অসচেতনতা রয়েছে, তা দূর করা এখন সময়ের দাবি।
ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই চরফ্যাশন উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সচেতন মহল এবং মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন।
মানুষের ধারণা, অপরাধী যদি কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যও হন, তবুও আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
ভোলা জেলার চরফ্যাশনের শশীভূষণে ঘটে যাওয়া এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
সাত বছরের শিশুটি এখন যে মানসিক ও শারীরিক ট্রমা বা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে তাকে মুক্ত করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করে আসামিকে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এখন বিচারিক আদালতের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার রায় প্রদান করা উচিত। যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়।
সমাজ থেকে এই ধরনের অন্ধকার দূর করতে হলে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং শিশুদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।
