সুনামগঞ্জের সীমান্তে সাড়ে ৯৫০ পিস ইয়াবাসহ আটক তথাকথিত ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিমেল। মাদকবিরোধী সংগঠনের আড়ালে যেভাবে চলত তার এই সিন্ডিকেট, জানুন বিস্তারিত প্রতিবেদনে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: জনগণের আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সীমান্তজুড়ে মাদকের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল এক যুবক। নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করলেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে প্রায় এক হাজার পিস ইয়াবাসহ স্থানীয় জনতার হাতে ধরা পড়েছে নাজমুল হাসান হিমেল ও তার এক সহযোগী। উত্তেজিত জনতার গণপিটুনির পর পুলিশ তাদের উদ্ধার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। গত বুধবার রাতে তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির আওতাধীন পুরান লাউড়েরগড় মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। আটককৃত হিমেল বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের ছাতারকোণা গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে। তার সহযোগী সোহাগ আহমেদও একই এলাকার বাসিন্দা।
যেভাবে জালে জড়াল ইয়াবা সিন্ডিকেট
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে একটি মোটরসাইকেলে করে হিমেল ও সোহাগ ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ফিরছিলেন।
তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে লাউড়েরগড় এলাকার বাসিন্দারা মোটরসাইকেলটির গতি রোধ করেন।
এরপর জনতা তাদের তল্লাশি চালালে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। তাদের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয় সাড়ে ৯৫০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট।
এই বিপুল পরিমাণ মাদক দেখার পর উপস্থিত জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা দুই যুবককে একটি দোকানের খুঁটির সাথে বেঁধে গণধোলাই দেওয়া শুরু করেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিবর্গ পুলিশে খবর দেন।
ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী ও সাবেক ইউপি সদস্য মোস্তফা মিয়া বলেন:
“এলাকার মানুষ হিমেলের সীমান্ত পারাপারের ওপর নজর রাখছিল। হাতেনাতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ তাকে ধরার পর উত্তেজিত জনতা তাকে পিটিয়ে মেরেই ফেলত। আমরা সময়মতো হস্তক্ষপে করে পুলিশে খবর না দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে যেতে পারত। সে মূলত ভারত থেকে মাদকের বড় চালান এনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করত।”
‘জুলাই যোদ্ধা’র সাইনবোর্ড ও চাঁদাবাজির অন্ধকার অধ্যায়
৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হিমেল নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সামনের সারির কর্মী বা ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে জাহির করা শুরু করে।
তার ভাই তোফায়েল আহমদ বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যুগ্ম সদস্যসচিব হওয়ার সুবাদে হিমেলের প্রভাব ছিল আকাশচুম্বী।
ধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল আহমদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান,
হিমেল জুলাই আন্দোলনের সময় মিছিল-সমাবেশে অংশ নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই পরিচয়কে সে অপকর্মের হাতিয়ার বানায়।
৫ই আগস্টের পর এই পরিচয়ের দাপট দেখিয়ে সে এলাকার বহু নিরীহ মানুষকে মামলার ভয় দেখিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করেছে।
মূলত নিজের অপরাধ আড়াল করতেই সে এই রাজনৈতিক ঢাল ব্যবহার করছিল।
মাদকবিরোধী সংগঠনের আড়ালে ‘আওয়ামী লীগ ট্যাগ’ বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজেকে সাধু প্রমাণ করতে হিমেল লোকদেখানো একটি ‘মাদকবিরোধী সংগঠন’ গড়ে তোলে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের একজন সাধারণ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হিমেলের মূল ব্যবসাই ছিল দ্বিমুখী নীতি।
একদিকে সে মাদকের বিরুদ্ধে ব্যানার ফেস্টুন টানাত, অন্যদিকে নেপথ্যে নিজেই ছিল বড় ডিলার।
এলাকার কেউ যদি তার এই অনৈতিক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সামান্যতম টু শব্দ করত,
হিমেল তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ বা ‘স্বৈরাচারের দোসর’ বলে ট্যাগ দিয়ে দিত।
এরপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখাত। ফলে চরম আতঙ্কে এলাকার কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পেত না।
আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য
গণপিটুনির খবর পেয়ে বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মোখলেছুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হিমেল ও সোহাগকে জনতার কবল থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এএসআই মোখলেছুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “আটককৃত যুবকের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী সংগঠনের আড়ালে মাদক চোরাচালানের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আমরা জনতা কর্তৃক উদ্ধারকৃত সাড়ে ৯৫০ পিস ইয়াবাসহ তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেছি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে তাদের সুনামগঞ্জ আদালতে পাঠানো হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।”
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ মতামত
এই গ্রেপ্তারের পর সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন,
জুলাই আন্দোলনের মতো একটি পবিত্র ও ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের নাম ভাঙিয়ে যারা নিজেদের পকেট ভারী করছে এবং মাদক কারবার চালাচ্ছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করা উচিত।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের পর এমন কিছু সুবিধাবাদী ‘হাইব্রিড’ অপরাধী চক্রের উত্থান ঘটে।
এরা নতুন প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে নিজেদের ‘সংস্কারপন্থী’ বা ‘আন্দোলনকারী’ হিসেবে সাজায়।
সুনামগঞ্জের এই ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় বার্তা, যাতে আন্দোলনের সাইনবোর্ডধারী প্রতিটি সন্দেহভাজন ব্যক্তির অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হয়।
পুলিশ প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় নেই।
সে যে দলেরই বা যে পরিচয়েরই হোক না কেন, মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধির সাথে জড়িত থাকলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান রোধে পুলিশের এই কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
