সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত এক বছরে ৪১ শতাংশ বেড়ে ৮৩ কোটি ফ্রাঁ ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসএনবি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
অনলাইন ডেস্ক | ঢাকা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি)-এর সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫-এ এই চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এক নজরে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের খতিয়ান
সুইস ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
২০২৫ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মোট জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ।
এর ঠিক আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
দেশীয় মুদ্রার হিসাবে এই অর্থের অঙ্ক বিশাল। বর্তমান বাজারে প্রতি সুইস ফ্রাঁর বিনিময় মূল্য ১৫২ থেকে ১৫৩ টাকা বিবেচনা করলে,
২০২৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।
| সাল | জমার পরিমাণ (সুইস ফ্রাঁ) | দেশীয় মুদ্রায় আনুমানিক মূল্য (টাকা) |
| ২০২৪ | ৫৯ কোটি ফ্রাঁ | প্রায় ৮,৯৬৮ কোটি টাকা |
| ২০২৫ | ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ফ্রাঁ | প্রায় ১২,৬৭৮ কোটি টাকা |
গ্রাফ ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত এক দশকে ২০২৫ সালের এই জমার পরিমাণটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড।
কেন এই আকস্মিক উত্থান? পটভূমি ও রাজনৈতিক সমীকরণ
২০২১ সালের পর ২০২৫ সালেই বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে।
এর আগে ২০২২ এবং ২০২৩ সালে টানা দুই বছর এই জমার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছিল।
ওই দুই বছর জমার পরিমাণ নেমে এসেছিল যথাক্রমে সাড়ে ৫ কোটি এবং পৌনে ২ কোটি সুইস ফ্রাঁতে।
কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তন এই চিত্রে বড় ধরনের বদল এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পটভূমি বিশ্লেষণ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর সরকারের অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তাদের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাদের অনেকের দেশীয় সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে অনেকে নিজেদের অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করেছেন, যার একটি বড় অংশ সুইস ব্যাংকিং সিস্টেমে প্রবেশ করেছে।
সমস্ত অর্থই কি অবৈধ বা পাচারকৃত? যা বলছে সুইস ব্যাংক
সুইস ব্যাংকে টাকা থাকা মানেই সেটি সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে অর্জিত বা পাচার করা অর্থ—এমন ঢালাও মন্তব্য সঠিক নয়।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে,
এই হিসাবটি মূলত সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোর প্রতি অন্যান্য দেশের “আর্থিক দায়বদ্ধতা” (Liabilities)। এই আমানতের পেছনে কয়েকটি বৈধ ও অবৈধ উৎস রয়েছে:
বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক আমানত: বাংলাদেশের অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও এলসি (LC) নিষ্পত্তির সুবিধার্থে বৈধ উপায়ে সুইস ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থ: বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে তাদের বৈধ আয় সঞ্চয় হিসেবে রাখেন।
আন্তর্জাতিক শাখার হিসাব: সুইজারল্যান্ডের বাইরে বিশ্বের অন্যান্য দেশে অবস্থিত সুইস ব্যাংকের শাখাগুলোতে বাংলাদেশিরা যে অর্থ জমা রাখেন, তাও এই কেন্দ্রীয় হিসাবে যুক্ত হয়।
অবৈধ অর্থ বা ক্যাপিটাল ফ্লাইট: ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা ওভার-ইনভয়েসিং এবং হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শ্বেতপত্র ও অর্থ পাচার বিতর্ক: অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
বিগত সরকারের আমলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, যার প্রমাণ মিলেছে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রে।
এই প্রেক্ষাপটে সুইস ব্যাংকের নতুন ডাটা দেশের অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তার মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশ থেকে মূলধন পাচার বা ক্যাপিটাল ফ্লাইট কমে আসবে।
কিন্তু সুইস ব্যাংকের এই নতুন পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, অর্থ পাচারের ধারা এখনো থামানো সম্ভব হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, সুইজারল্যান্ড ছাড়াও বিশ্বের আরও অনেক দেশে, যেমন- দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা কানাডায় বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বর্তমান সরকার এই অবৈধ অর্থ পাচার প্রতিরোধে এবং অতীতে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বদলে যাওয়া সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও তথ্যের গোপনীয়তা
এক সময় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো ছিল বিশ্বজুড়ে কর ফাঁকিদাতা ও অর্থ পাচারকারীদের অন্যতম প্রধান নিরাপদ স্বর্গ। এর মূল কারণ ছিল দেশটির কঠোর ‘ব্যাংকিং গোপনীয়তা আইন’। অতীতে সুইস ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের তথ্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করত এবং কোনো দেশের সরকারের কাছে তথ্য প্রকাশ করত না।
তবে আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বৈশ্বিক চুক্তির কারণে গত কয়েক বছরে এই দৃশ্যপটে আমূল পরিবর্তন এসেছে।
ফলে, সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে অবৈধ টাকা রাখার ঝুঁকি বাড়ায় এখন অনেকেই প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বাণিজ্যের আড়ালে ছদ্মবেশে অর্থ পাচারের নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য করণীয় ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার এই ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। ডলার সংকট ও রিজার্ভের ওপর চাপের এই সময়ে দেশ থেকে মূলধন বাইরে চলে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের করণীয় পদক্ষেপগুলো হতে পারে:
টাস্কফোর্স গঠন: পাচার হওয়া অর্থ চিহ্নিত করতে এবং তা ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা।
মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (MLA): সুইজারল্যান্ড সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি জোরদার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করা।
বাণিজ্যিক নজরদারি: আমদানি-রপ্তানির আড়ালে যাতে অর্থ পাচার (Trade-based Money Laundering) না হয়, সেজন্য কাস্টমস ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অডিট ব্যবস্থা আরও কঠোর করা।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের এই প্রতিবেদনটি বর্তমান নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশের ভেতরের আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে এই প্রবণতা রোধ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা।
