জুলাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য টাইগার লাইটনিং-২০২৬ মহড়া ঘিরে উত্তাল ঢাকা। ১১ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার উপস্থিতি ও দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। আগামী জুলাই মাসে অনুষ্ঠিতব্য ‘টাইগার লাইটনিং-২০২৬’ (TL26) সামরিক মহড়াকে সামনে রেখে বর্তমানে রাজধানী ঢাকার গুলশানে অবস্থিত ওয়েস্টিন হোটেল পরিণত হয়েছে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের একটি প্রধান হাবে। নর্থইস্ট নিউজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ১১ সদস্যের একটি শক্তিশালী মার্কিন প্রতিনিধি দল এখন এই মহড়ার রূপরেখা ও প্রাথমিক ভিত্তি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে।
ওয়েস্টিন হোটেলে মার্কিন ‘টাস্ক ফোর্স’
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অনুরোধে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সবুজ সংকেতে এই সামরিক কর্মকর্তাদের ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ প্রদান করা হয়েছে।
গত ২৮ এপ্রিল থেকে তারা ঢাকায় আসা শুরু করেন।
তিন সদস্যের একটি প্রাথমিক দল মেজর কেট হেলেনা হাওয়ার্ডের নেতৃত্বে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে পৌঁছানোর পর ধাপে ধাপে আরও আটজন কর্মকর্তা এই দলে যোগ দিয়েছেন।
ঢাকার বারিধারার মার্কিন দূতাবাস এই কর্মকর্তাদের জন্য ওয়েস্টিন হোটেলে আবাসন নিশ্চিত করেছে।
এই দলে এমন কিছু কর্মকর্তা রয়েছেন যারা যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং দক্ষ।
আফগান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি
এই প্রতিনিধি দলে থাকা সদস্যদের সামরিক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করলে এক গভীর পরিকল্পনার আভাস পাওয়া যায়।
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- স্টিভেন ওলসন: ২০১২ সালে আফগানিস্তানের আরঘান্দাব নদী উপত্যকায় ৫০৮তম প্যারাসুট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
- ট্র্যাভিস হাগমেয়ার: তিনিও আফগানিস্তান যুদ্ধের একজন অভিজ্ঞ সৈনিক।
- মেজর ট্রয় ব্যাগনাল: ২০০৪ সালে ইরাকের নাজাফ যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই কর্মকর্তা বর্তমানে ওরেগন আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের ১৬২তম ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে কর্মরত এবং আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা মহড়ায় দক্ষ হিসেবে পরিচিত।
- মাইকেল কেরি: তিনি মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ডের (USARPAC) একজন সিনিয়র অপারেশনস লিডার, যার দায়িত্ব হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মিত্র দেশগুলোর সাথে সমন্বয় করে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা।
টাইগার লাইটনিং-এর অতীত ও বর্তমান
২০২৫ সালের জুলাই মাসে সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে টাইগার লাইটনিং-২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো এবং মার্কিন নেভাদা ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা অংশ নেন।
জঙ্গল ওয়ারফেয়ার, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং মেডিকেল ইভাকুয়েশনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত সেই মহড়াটি ছিল দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের চতুর্থ পর্যায়।
২০২৬ সালের মহড়াটি আরও বড় পরিসরে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ: ভারত ও চীনের অবস্থান
বাংলাদেশের বর্তমান তারেক রহমান সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই ড. ইউনূসের আমলের নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধি ভারত ও চীনের কৌশলগত স্বার্থে আঘাত করতে পারে।
- ভারতের নিরাপত্তা ঝুঁকি: মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের এই উপস্থিতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ: দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের অবস্থান শক্ত করতে এবং চীনকে প্রতিহত করতে আমেরিকা বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় বলে গুঞ্জন রয়েছে।
তারেক সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার কি তবে মার্কিন স্বার্থ বাস্তবায়নের পথেই হাঁটছে? এই প্রশ্নটি এখন কূটনৈতিক মহলে প্রকট।
ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত শেখ হাসিনাকে হটিয়ে ক্ষমতার এই নতুন সমীকরণ কি তবে আমেরিকাকে বাংলাদেশে প্রক্সি ঘাঁটি তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে?
ভারত ও চীনের পক্ষ থেকে যদি এই পরিস্থিতিকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখা হয়,
তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এক বড় ধরণের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ভারতের সেভেন সিস্টার্স এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উসকে যাওয়ার ভয়ও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ল এখন ভারতের কোর্টে?
টাইগার লাইটনিং-২০২৬ কেবল একটি সাধারণ সামরিক মহড়া নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যের এক বড় নির্দেশক।
একদিকে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের সরব উপস্থিতি, অন্যদিকে আঞ্চলিক পরাশক্তিদের নীরবতা—সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর শান্তি বিরাজ করছে।
ভারত যদি দ্রুত এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কূটনৈতিক কোনো ব্যবস্থা না নেয়,
তবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশকে নিয়ে বড় ধরণের পরিবর্তন আসতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, তারেক রহমান সরকার এই বহুমুখী চাপ সামলে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে।
