৫ আগস্টের পর সাংবাদিকদের ওপর মামলা ও দমন-পীড়ন নিয়ে মুখ খুললেন মুন্নী সাহা। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ভূমিকা নিয়ে তুলেছেন তীব্র প্রশ্ন।
দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর অবশেষে জনসমক্ষে এলেন দেশের আলোচিত ও সিনিয়র সাংবাদিক মুন্নী সাহা। ৫ আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা যখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখন তার এই উপস্থিতি এবং সরাসরি আক্রমণাত্মক বক্তব্য গণমাধ্যম পাড়ায় নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর রহস্যজনক নীরবতাকে তিনি ‘পেশাদারিত্বের অবমাননা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সাংবাদিক না কি খুনি? বাকস্বাধীনতার কালো অধ্যায়
মুন্নী সাহার বক্তব্যের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে ছিল সংবাদকর্মীদের আইনি হয়রানির বিষয়টি।
তিনি অভিযোগ করেন যে, ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তার মতে:
- শত শত পেশাদার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই ঢালাওভাবে হত্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে।
- পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ‘খুনি’ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে, যা বিশ্ব সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিরল।
- পেশাদার সাংবাদিকদের গণহারে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এক ধরণের ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে সরাসরি তোপ
মুন্নী সাহার সমালোচনার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের প্রভাবশালী দুই গণমাধ্যম— প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন তোলেন,
যখন মাঠপর্যায়ের এবং মাঝারি সারির সাংবাদিকরা মামলার জালে জড়িয়ে পড়ছিলেন, তখন এই প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো কেন কার্যকর ভূমিকা নেয়নি।
মুন্নী সাহার অভিযোগের মূল পয়েন্টগুলো:
১. সুবিধাবাদী অবস্থান: তার মতে, এই বড় পত্রিকাগুলো নিজেদের ইমেজ রক্ষায় বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল, যার ফলে তারা সহকর্মীদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।
২. নীরবতার সংস্কৃতি: সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে বা এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট প্রকাশ না করায় তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘সুবিধাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দেন।
৩. ঐক্যের অভাব: সাংবাদিকরা যখন সবচেয়ে বেশি বিপদে ছিলেন, তখন বড় মিডিয়া হাউসগুলো ছোট প্রতিষ্ঠানের সংবাদকর্মীদের একাকী ফেলে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নিজের অবস্থান ও অপপ্রচারের জবাব
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে বা আড়ালে থাকা নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা চললেও মুন্নী সাহা জানান যে, তাকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
৫ আগস্টের পর তিনি যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সত্যের পক্ষে অনড় থাকাই আজ তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি দাবি করেন, মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও সাংবাদিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সবার এক থাকা উচিত ছিল।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের গভীর সংকট
মুন্নী সাহার এই বক্তব্য বাংলাদেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের ফাটলগুলোকে প্রকাশ্যে এনেছে।
- আস্থার সংকট: বড় পত্রিকাগুলোর প্রতি সাধারণ সাংবাদিক ও পাঠকদের আস্থার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, মুন্নী সাহার বক্তব্য তাকেই প্রতিধ্বনিত করে।
- আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।
- পেশাদারিত্ব বনাম এজেন্ডা: সংবাদপত্রের প্রধান দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা হলেও, যখন কর্পোরেট বা রাজনৈতিক স্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন প্রকৃত সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয়।
ঐক্য না কি অবলুপ্তি?
মুন্নী সাহার এই বিস্ফোরক জবানবন্দি কেবল একটি ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়,
বরং এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
সাংবাদিকরা যদি আজ ঐক্যবদ্ধ না হতে পারেন এবং বড় গণমাধ্যমগুলো যদি কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট থাকে,
তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম তার গ্রহণযোগ্যতা পুরোপুরি হারাবে।
৫ আগস্ট পরবর্তী এই পরিস্থিতির উত্তরণ কীভাবে ঘটবে এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ‘ঢালাও মামলা’ নিয়ে রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
তবে মুন্নী সাহা যে বিতর্কের জন্ম দিলেন, তার রেশ অনেক দিন থাকবে।
