রংপুরে ৮২৭ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ। চলতি মৌসুমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির আশা করছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
রংপুরের লিচুতে ৩০০ কোটি টাকার সম্ভাবনা, হাসি ফুটছে চাষিদের মুখে
এক সময় দেশের লিচুর বাজারে দিনাজপুরের আধিপত্য থাকলেও গত কয়েক বছরে সেই চিত্রে পরিবর্তন এসেছে। হাঁড়িভাঙা আমের জন্য পরিচিত রংপুর এখন লিচু উৎপাদনেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। চলতি মৌসুমে জেলার লিচু চাষিরা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ব্যবসার আশা করছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদন বৃদ্ধি, অনুকূল আবহাওয়া এবং বাজারে ভালো দামের কারণে এবার লিচু চাষে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উৎপাদনে রেকর্ড অগ্রগতি
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮২৭ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১০ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ফলন ধরা হলে মোট উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ৮ হাজার ৬৬ মেট্রিক টন।
এই উৎপাদনের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন ও বাজার সম্ভাবনা দুটোই ইতিবাচক।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, রংপুরে প্রতিবছর লিচুর উৎপাদন বাড়ছে। অনেক কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে লিচুর বাগান গড়ে তুলছেন এবং উল্লেখযোগ্য লাভ করছেন।
বাজারে রংপুরের লিচুর দাপট
বর্তমানে রংপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা লিচু স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে বাজারে আসা লিচুর প্রায় ৯৫ শতাংশই রংপুর অঞ্চলের উৎপাদিত।
দিনাজপুরের লিচু এখনো পুরোপুরি বাজারে না আসায় রংপুরের লিচুর চাহিদা বেড়েছে। নগরীর সিটি বাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতিদিন সকাল থেকেই জমজমাট কেনাবেচা চলছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বিশেষ করে হাড়িয়া ও মাদ্রাজি জাতের লিচুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে প্রতি হাজার লিচু আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে এগিয়ে হাড়িয়া ও মাদ্রাজি
রংপুরে উৎপাদিত প্রধান লিচুর জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- হাড়িয়া
- চায়না-২
- চায়না-৩
- মাদ্রাজি
এর মধ্যে হাড়িয়া ও মাদ্রাজি জাতের লিচু স্বাদ, আকার এবং বাজারমূল্যের কারণে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস মিয়া জানান, তারাগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর লিচু উৎপাদিত হচ্ছে। তারা সরাসরি বাগান থেকে লিচু কিনে দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করছেন।
কৃষকদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুর অঞ্চলে আমের পাশাপাশি লিচুও এখন একটি লাভজনক অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। অনেক কৃষক ধান বা অন্যান্য মৌসুমি ফসলের পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে ফলের বাগান গড়ে তুলছেন।
ফলে শুধু চাষিরাই নয়, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং শ্রমনির্ভর বিভিন্ন খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, ফলভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লিচু কেনার সময় সতর্কতা
বাংলা একাডেমির সহপরিচালক এবং কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না ক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় কৃত্রিমভাবে রং ব্যবহার করে লিচুকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।
তাই শুধুমাত্র উজ্জ্বল লাল রং দেখে লিচু না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, লাল ও সবুজের মিশ্রণযুক্ত স্বাভাবিক রঙের লিচু সাধারণত বেশি সুস্বাদু ও নিরাপদ হয়ে থাকে।
শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কবার্তা
লিচুর মৌসুমে শিশুদের বিষয়ে অভিভাবকদের বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট ডা. মোস্তারী বেগম মিতা বলেন, শিশুদের একা একা লিচু খেতে দেওয়া উচিত নয়।
কারণ লিচুর বিচি গলায় আটকে শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা খালি পেটে অতিরিক্ত লিচু খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়, যা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রংপুরে লিচু উৎপাদনের ধারাবাহিক সাফল্য কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারে উচ্চ চাহিদা
এবং ভালো দাম—সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে চাষিদের ঘরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা প্রবেশের আশা করা হচ্ছে।
তবে বাজারজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ ভোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ভবিষ্যতে রংপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ লিচু উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
