২০২৪ সালের জুলাই সহিংসতার অন্তরালে গোয়েন্দা চাল। জেনারেল হামিদ, ডিজিএফআই-এর ভূমিকা এবং সমন্বয়কদের আটকের অন্তর্নিহিত সত্য উন্মোচনে বিশেষ বিশ্লেষণ।
বিশেষ অনুসন্ধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেস্ক: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছে। তবে এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সম্মুখভাগের আন্দোলনের পাশাপাশি পর্দার আড়ালে রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ স্তরে কী ধরণের মনস্তাত্ত্বিক খেলা এবং গোয়েন্দা চাল চালানো হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও বহু ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। বিশেষ করে তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) এবং এর তৎকালীন নীতি-নির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে এখন নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসছে।
ইতিহাসের সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে এবং তৎকালীন শাসন ব্যবস্থার ভেতরের ভাঙন ও কৌশলগুলো বুঝতে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আলোকপাত করা জরুরি।
অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক (যিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জেনারেল হামিদ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন) জুলাই সহিংসতাকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার এবং প্রকারান্তরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করার পেছনে এক অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত সুনিপুণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সমন্বয়কদের অন্তর্ধান রহস্য: বলির পাঁঠা কি কেবল ডিবি হারুন?
জুলাই আন্দোলনের তীব্রতম সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল সমন্বয়কদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি পুরো দেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
সাধারণ জনমানসে এবং গণমাধ্যমের পাতায় এই পুরো দায় চাপানো হয়েছিল তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রধান হারুন-অর-রশীদ এবং তার ভাতের হোটেলের ওপর।
তবে ভেতরের বিশ্বস্ত সূত্রগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আরও গভীর এক সত্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং এর তীব্রতা বাড়ানোর লক্ষে তথাকথিত ‘সমন্বয়ক’ নামধারী প্রধান প্রধান নেতৃত্বকে রাজপথ থেকে তুলে আনার মূল রূপরেখাটি তৈরি হয়েছিল উত্তর পাড়ার একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার টেবিলে।
- নাহিদ ইসলামের ওপর নির্যাতন: আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ মুখ নাহিদ ইসলামকে প্রথম দফায় যখন তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তাকে নির্মম শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তাকে মারাত্মক জখম অবস্থায় ঢাকার ৩০০ ফিট বা পূর্বাচল এলাকায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়।
- গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি: উদ্ধার হওয়ার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নাহিদ ইসলামকে চিকিৎসার জন্য গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এই পুরো অপারেশনের পেছনে ডিবির কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরির ছক।
ডিজিএফআই থেকে ডিবি কার্যালয়: প্রধানমন্ত্রীর ধমক এবং হস্তান্তরের নেপথ্য কাহিনী
২৪ জুলাই ও এর পরবর্তী সময়ে যখন ৫ জন শীর্ষ সমন্বয়ককে পুনরায় ডিবি হেফাজতে দেখা যায়, তখন ধারণা করা হয়েছিল এটি পুরোপুরি পুলিশের একক অ্যাকশন।
কিন্তু প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহের কালপঞ্জি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পুরো নাটকটির স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিল অন্য কেউ।
সমন্বয়ক আটকের আসল টাইমলাইন (২০২৪)
├── ২২-২৩ জুলাই: ডিজিএফআই কর্তৃক সমন্বয়কদের অজ্ঞাত স্থানে তুলে নেওয়া ও জিজ্ঞাসাবাদ।
├── ২৬ জুলাই: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তীব্র ধমক খেয়ে তড়িঘড়ি করে ডিবিতে হস্তান্তর।
└── ২৮ জুলাই: রাজারবাগ হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশ ও পরিবারের কাছে ফেরতের নির্দেশ।
২২ থেকে ২৩ জুলাই ২০২৪ তারিখের মধ্যে এই সমন্বয়কদের মূলত ডিজিএফআই-এর একটি বিশেষ দল নিজেদের হেফাজতে নেয়।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে যখন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে,
তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও ধমক দেন।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পারার দায় এড়াতে ২৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে তড়িঘড়ি করে এই ৫ সমন্বয়ককে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে, ২৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যখন রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত পুলিশ সদস্যদের পরিদর্শনে যান,
তখন তিনি ডিবি হেফাজতে থাকা শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানতে পেরে চরম উষ্মা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি অনতিবিলম্বে তাদের অভিভাবকদের ডেকে এনে, তাদের উপস্থিতিতেই নিজ নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন।
ফলে, ডিবি প্রধান হারুন এখানে কেবল দৃশ্যমান ফ্রন্টম্যান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন, যার নেপথ্যের সুতো ছিল অন্য হাতে।
আশ্বাসের আড়ালে ফাঁদ: “রাজনীতি বনাম গোয়েন্দা চাল”
জুলাই মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারক ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা বারবার এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে বা আলোচনার টেবিলে সমাধানের প্রস্তাব করেছিলেন।
কিন্তু প্রতিবারই গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে, বিশেষ করে জেনারেল হামিদের পক্ষ থেকে সরকারকে আশ্বস্ত করা হতো যে,
“পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি খুব দ্রুতই থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।”
এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা ভুল গোয়েন্দা তথ্য তৎকালীন সরকারকে এক ধরণের অন্ধত্বের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।
রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন মোকাবেলার সুযোগগুলো যখনই এসেছে,
তখনই এক ধরণের অদৃশ্য বাধা বা কঠোর বলপ্রয়োগের প্রেসক্রিপশন দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলা হয়েছিল।
যার ফলে সরকারের ভেতরের অনেকেই সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন যে, এই ধরণের কৌশল কি আসলেই সরকারকে বাঁচানোর জন্য,
নাকি সরকারের পতনকে আরও অবশ্যম্ভাবী করে তোলার কোনো গোপন এজেন্ডা ছিল।
“ফিসি” ভূমিকা ও উত্তর পাড়ার বিশেষ নিষেধাজ্ঞা: নথিপত্রের খণ্ডচিত্র
২২ জুলাই ২০২৪ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন,
“স্যার, ডিজিএফআই এর চীফ এর ভূমিকা কিন্তু বেশ ’ফিসি’ (সন্দেহজনক)।”
এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে যে, সরকারের ভেতরের একটি অংশও গোয়েন্দা প্রধানের কার্যকলাপে সন্তুষ্ট হতে পারছিল না।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এক অদ্ভুত প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়।
২৩ জুলাই ২০২৪ তারিখে দুপুরে জননিরাপত্তা সচিবের দপ্তরে উত্তর পাড়ার (ক্যান্টনমেন্ট এলাকা) একটি বিশেষ সূত্র থেকে বার্তা পাঠানো হয়।
বার্তায় পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয় যে, পরবর্তীতে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত যতগুলো নীতি-নির্ধারণী মিটিং হবে,
সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্দিষ্ট দপ্তরের প্রধান এবং সংস্থা প্রধান ছাড়া অন্য কোনো মধ্যম বা কনিষ্ঠ কর্মকর্তার উপস্থিতি যেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
এই ধরণের তথ্য গোপন করার প্রবণতা এবং সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাদের আলোচনার বাইরে রাখার চেষ্টা প্রমাণ করে যে,
পর্দার আড়ালে এক বিশাল তথ্য ফিল্টারিংয়ের খেলা চলছিল।
ইতিহাসের স্বার্থে সত্যের উন্মোচন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আবশ্যকতা
একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে যখন এত বড় একটি গণ-অভ্যুত্থান এবং শত শত প্রাণের বিসর্জন ঘটে, তখন তার পেছনের প্রতিটি ছোট-বড় ঘটনার সত্যতা নিরূপণ করা জরুরি।
কেবল রাজনৈতিক দল বা দৃশ্যমান পুলিশ কর্মকর্তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেই ইতিহাসের সম্পূর্ণ সত্য উন্মোচিত হবে না।
ডিজিএফআই-এর মতো একটি সংবেদনশীল ও জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির শীর্ষ পদে থেকে কারা দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করেছিলেন,
কারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছিলেন এবং কারা আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনাগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে উস্কে দিয়েছিলেন
—তা একটি স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া উচিত।
ইতিহাসের স্বার্থে এই সত্য উদ্ঘাটিত হওয়া সময়ের দাবি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যক্তিস্বার্থ বা গোপন চক্রান্তের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না যায়।
