বেনজীর আহমেদের দুবাই বিতর্ক এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম সংকটে। রাজনৈতিক এজেন্ডা বনাম জনস্বার্থের আসল বাস্তবতা।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেন এক অন্তহীন নাট্যমঞ্চ, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন চিত্রনাট্য মঞ্চস্থ হয়। অতি সম্প্রতি দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সাবেক পুলিশ ও র্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদের দুবাই সফর এবং তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আইনি ধোঁয়াশা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের নীতি এবং দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর প্রচার কৌশল এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি করেছে। একদিকে যখন একটি আন্তর্জাতিক প্রটোকলকে ‘গ্রেফতার’ হিসেবে বাজারজাত করার মরিয়া চেষ্টা চলছে, ঠিক অন্যদিকে তখন আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে দেশের লাখো শিশুর জীবনের নিরাপত্তা।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এই দ্বিচারিতা এবং প্রচারণানির্ভর রাজনীতি আজ সচেতন সমাজকে এক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
দুবাইয়ের আইনি ব্যবস্থা ও বেনজীর অধ্যায়ের আসল সত্য
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বিশেষ করে দুবাইয়ের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
সেখানকার অভিবাসন বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো পদক্ষেপের প্রকৃত রূপ কেবল স্থানীয় ভূখণ্ডে অবস্থানকারীরাই সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন।
দূর থেকে অনুমাননির্ভর সংবাদ পরিবেশন যে কতটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে, বেনজীর আহমেদের সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনাই তার বড় প্রমাণ।
বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে দুবাইয়ের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের যে সংযোগটি তৈরি হয়েছিল, তা কোনোভাবেই ‘গ্রেফতার’ বা ‘আটক’ ছিল না।
প্রকৃতপক্ষে সেখানে কী ঘটেছিল?
- নিয়মিত আইনি উপস্থিতি: দুবাইয়ের অভিবাসন নীতি অত্যন্ত কঠোর। একজন বিদেশি নাগরিকের অবস্থান বা ভিসা সংক্রান্ত টেকনিক্যাল বিষয়ে আলোচনার জন্য তাকে সশরীরে দপ্তরে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল।
- সাক্ষাৎকার ও সাধারণ প্রক্রিয়া: এটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি সাক্ষাৎকার পর্ব। উন্নত বিশ্বে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসন সংক্রান্ত ফাইল পর্যালোচনার জন্য এ ধরনের তলব অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।
- মুক্ত ও স্বাভাবিক চলাচল: জিজ্ঞাসাবাদ বা প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পর তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই নিজের গন্তব্যে ফিরে যান। কোনো ধরনের আইনি নিষেধাজ্ঞা বা বন্দিত্বের শিকার তিনি হননি।
অথচ বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়াগুলো একে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন এক বিশাল আন্তর্জাতিক অপরাধীকে খাঁচায় বন্দি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার বনাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা নাগরিক যখন বিদেশে কোনো আইনি জটিলতায় পড়েন, তখন সেই রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত— তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সুনির্দিষ্ট প্রটোকল রয়েছে।
একটি তুলনামূলক চিত্র: পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমেরিকার কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক প্রধান যদি বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে সামান্যতম আইনি ঝামেলার মুখোমুখি হন, তবে ওয়াশিংটন সবার আগে তার নাগরিকের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে।
কারণ, ওই ব্যক্তির সম্মান মানেই সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সম্মান।
আমাদের দেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত।
এখানে রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি বা সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্মান রক্ষার চেয়ে সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রবণতাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত করে হলেও পূর্ববর্তী ব্যবস্থার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের হেনস্তা করাই যেন বর্তমান প্রশাসনের একমাত্র লক্ষ্য।
সংসদ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা: শোরগোলের নেপথ্যে কী?
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার হয়েছেন কি হননি— তা নিয়ে দেশের জাতীয় সংসদে পর্যন্ত তুমুল শোরগোল ও হইচই করা হয়েছে। বর্তমান ‘নির্বাচিত’ দাবি করা সংসদের সংসদ সদস্যরা যেভাবে এই একটিমাত্র ইস্যু নিয়ে মেতে আছেন, তা দেখে মনে হতে পারে দেশের আর কোনো সমস্যা নেই।
গণমাধ্যমগুলোও একই সুর মিলিয়ে দিন-রাত টকশো এবং ব্রেকিং নিউজের মাধ্যমে জনমনে একটি কৃত্রিম উত্তেজনা জিইয়ে রাখছে।
কিন্তু এই অতি-উৎসাহের আড়ালে কোন ভয়ঙ্কর সত্যকে চেপে যাওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে কেউ কথা বলছে না।
আড়ালে ঢাকা পড়া স্বাস্থ্য সংকট: শিশুর জীবন বনাম রাজনৈতিক এজেন্ডা
যখন দেশের নীতিনির্ধারকেরা একজন ব্যক্তিকে নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই দেশের স্বাস্থ্য খাতে নেমে এসেছে এক নজিরবিহীন বিপর্যয়। বর্তমান প্রশাসনের চরম নীতিগত ব্যর্থতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং খামখেয়ালিপনার কারণে সময়মতো ‘হামের টীকা’ (Measles Vaccine) আমদানি বা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
সঠিক সময়ে হামের টিকা না পাওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশু আজ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে।
অথচ এই চরম মানবিক বিপর্যয় নিয়ে গণমাধ্যমে কোনো বিশেষ প্রতিবেদন নেই, সংসদে কোনো ‘টু’ শব্দটিও উচ্চারিত হচ্ছে না।
শিশুদের এই অকাল মৃত্যু যেন এক নীরব গণহত্যা, যা রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার চাদরে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
একচোখা রাজনীতির দেউলিয়াত্ব: জনগণের অধিকার কোথায়?
জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, শিশুদের জীবন বাঁচানো এবং স্বাস্থ্য খাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেকোনো গণতান্ত্রিক বা দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে এটি স্পষ্ট যে, তাদের প্রধান এজেন্ডা জনকল্যাণ নয়,
বরং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা এবং হেনস্তা করা।
যখন একটি রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে কেবল প্রতিশোধের রাজনীতিতে মগ্ন থাকে,
তখন সেই ব্যবস্থার নৈতিক ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব আড়াল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এটিই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্মম, নগ্ন এবং দুঃখজনক বাস্তবতা।
সচেতন নাগরিক সমাজের করণীয়
বেনজীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে, তা মূলত জনগণের দৃষ্টিকে মূল সংকট থেকে দূরে সরিয়ে রাখার একটি সুনিপুণ কৌশল।
মিডিয়া ট্রায়াল এবং রাজনৈতিক শোরগোলের মাধ্যমে সাময়িক ফায়দা পাওয়া গেলেও,
দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের জন্য কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনে না।
এখনই সময় দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলকে এই একচোখা রাজনীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলার।
টীকা না পেয়ে শিশুর মৃত্যু কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার চেয়ে জীবনের মূল্য যে অনেক বেশি,
এই সত্যটি রাষ্ট্রকে অনুধাবন করাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করার কোনো পথ থাকবে না।
