উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি। ৪৪ জলকপাট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, তিস্তাপাড়ে বন্যার শঙ্কা।
তিস্তার পানি বিপৎসীমার দ্বারপ্রান্তে, খুলে দেওয়া হলো ৪৪ জলকপাট
নিজস্ব প্রতিবেদক | রংপুর
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ধারাবাহিক বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তাপাড়ের নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষিজমি ও নিম্নভূমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
বিপৎসীমার কাছাকাছি তিস্তার পানি
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৯টায় দোয়ানী তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ০২ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা নির্ধারিত রয়েছে ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার মাত্র ১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, আগের দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি প্রায় ৩৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা আশঙ্কা করছেন, উজান থেকে ঢল অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
৪৪ জলকপাট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ
পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি বলেন, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ২০টি গেট খুলে দেওয়ার ফলে উজান থেকে বিপুল পরিমাণ পানি বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করছে।
তার মতে, পানি বৃদ্ধির ফলে তিস্তার চরাঞ্চলের বহু কৃষকের আবাদি জমি ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হতে পারে।
চরের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ
তিস্তাপাড়ের কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক শামসুল হক জানান, নদীর পানি ইতোমধ্যে তাদের এলাকায় প্রবেশ করেছে।
পানি আরও বাড়লে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারী এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, তাদের চরাঞ্চল ইতোমধ্যেই পানিতে ডুবে গেছে।
বর্তমানে তারা বাড়িতে থাকলেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হবেন।
অন্যদিকে মহিপুর চর এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন জানান, আমন ধানের বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চলমান পরিস্থিতি বড় ধরনের বন্যার পূর্বাভাস হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্ক নজরদারি
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানিয়েছেন, উজানের পাহাড়ি ঢল এবং বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি দ্রুত বাড়ছে।
পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন,
তিস্তা নদী ছাড়াও অন্যান্য নদ-নদীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, গঙ্গাধর,
জিনজিরাম ও ঘাঘট নদীতে বড় ধরনের বন্যার শঙ্কা না থাকলেও তিস্তাপাড়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তার পানি আরও বাড়লে চরাঞ্চল, কৃষিজমি ও নিম্নভূমির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তাই স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে।
