ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র বিজুকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। ওসির ভিন্ন দাবি। জানুন বিস্তারিত সংবাদ।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক নজিরবিহীন ও চরম নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা তথা সাবেক পৌর মেয়রকে দলীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ আত্মীয়-স্বজনরা প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনিয়ে নিয়েছে বলে তীব্র গুঞ্জন ও খবর ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র জেলা জুড়ে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে নানামুখী প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে আকস্মিক হানা
ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা, বর্তমান শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এবং কালীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক সফল মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান বিজু। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তার রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল থেকেই শহরের আড়পাড়া এলাকায় অবস্থিত সাবেক মেয়রের নিজস্ব বাসভবনের নিচতলায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল।
সেখানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে এক জমকালো কেক কাটা, বিশেষ আলোচনা সভা এবং মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছিল। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যখন দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সভাকক্ষে উপস্থিত হয়ে অনুষ্ঠান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই স্থানীয় থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল সেখানে আকস্মিক হানা দেয়।
ঘটনার বিবরণ: যেভাবে তৈরি হলো টানটান উত্তেজনা
উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা কোনো প্রকার পূর্ব নোটিশ ছাড়াই অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা প্রদান করে এবং এক পর্যায়ে সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান বিজুকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার বা ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এই খবর মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির ভেতরে থাকা তার আত্মীয়-স্বজন এবং বাইরে অবস্থানরত শত শত নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি: “পুলিশ যখন তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন উপস্থিত জনতা ও নারীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। একপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেষ্টনী উপেক্ষা করে স্বজন ও কর্মীরা পুলিশের ওপর চড়াও হন এবং তাকে আক্ষরিক অর্থেই টেনে বের করে নিয়ে যান।” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী।
রাজনৈতিক কর্মীদের একাংশের দাবি,
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায়ভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার কারণেই সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
তাদের মতে, এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের তাৎক্ষণিক ও সম্মিলিত জবাব।
পুলিশের দাবি ও ভিন্ন বক্তব্য: ‘ছিনতাই নয়, পালিয়েছেন বিজু’
এদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের কাছ থেকে আসামি বা সন্দেহভাজনকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগটি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে স্থানীয় থানা প্রশাসন। কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন ঘটনার ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের একটি দল নিয়মিত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে আড়পাড়া এলাকার ওই স্থানে গমন করেছিল।
কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান বিজু কৌশলে পেছনের দরজা বা অন্য কোনো উপায়ে ঘটনাস্থল থেকে আত্মগোপন করেন অথবা পালিয়ে যান।
ওসি জেল্লাল হোসেন আরও জানান যে, তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাবেক মেয়রের একটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ঘটনাস্থলে পড়ে যায়।
পুলিশ বর্তমানে সেই মোবাইল ফোনটি আইনগত প্রক্রিয়ায় নিজেদের হেফাজতে রেখেছে।
পরিবারের কোনো বৈধ সদস্য থানায় এসে যোগাযোগ করলে ফোনটি হস্তান্তর করা হবে।
তবে তল্লাশি বা বিশৃঙ্খলার সময় কোনো মানিব্যাগ উদ্ধারের খবরটি তিনি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন।
জনমনে প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ
এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্থানীয় চায়ের দোকানে এক বিশাল আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।
একদিকে প্রশাসনের দাবি এবং অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ রূপ—এই দুইয়ের বৈপরীত্যের কারণে এক রহস্যময় ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কিংবা অন্যায্য পুলিশি অ্যাকশনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার এই ঘটনাকে অনেকে ভবিষ্যৎ রাজনীতির নতুন ট্রেন্ড বা ধারা হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে,
যদি সত্যিই পুলিশি হেফাজত থেকে কাউকে মুক্ত করে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তবে তা স্থানীয় প্রশাসনের নিরাপত্তার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।
আর যদি রাজনৈতিক কারণে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে পুলিশ সেখানে গিয়ে থাকে,
তবে জনগণের এই প্রতিরোধ আগামী দিনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ
কালীগঞ্জ শহরের আড়পাড়া এলাকায় এই ঘটনার পর থেকে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান বিজু বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দলীয় নেতাকর্মীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশি হস্তক্ষেপের অবসান দাবি করেছেন।
সাধারণ নাগরিকদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির টানাপোড়েন কতটা গভীর।
এই ঘটনার রেশ ধরে আগামী দিনগুলোতে রাজনীতিতে কোনো নতুন মোড় আসে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
