নির্দিষ্ট মামলা ছাড়া শ্যোন অ্যারেস্ট ও হয়রানি না করার হাইকোর্টের নির্দেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। ৪ সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
আইন অঙ্গনে বহুল আলোচিত ও সংবেদনশীল একটি বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি মামলা বা দালিলিক প্রমাণ ছাড়া কোনো নাগরিককে যত্রতত্র ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ (Shown Arrest) বা নতুন কোনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে হেনস্তা না করার বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ যে নিষেধাজ্ঞা বা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছিলেন, তার কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে এই সংক্রান্ত রুলটি আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জন্য হাইকোর্টকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে দেশের প্রধান বিচারপতি ড. জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল আবেদনের শুনানি নিয়ে এই আদেশ প্রদান করেন। এর ফলে শ্যোন অ্যারেস্টের অপব্যবহার রোধে নিম্ন আদালত ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ওপর হাইকোর্টের যে কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত হলো।
শুনানিতে যে আইনি যুক্তিগুলো তুলে ধরা হয়
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রধান আইনজীবী হিসেবে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি আদালতের সামনে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের মূল ভিত্তি ও আইনি কাঠামোগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে, রিটকারী ও সাধারণ বিচারপ্রার্থী নাগরিকদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন দেশের প্রথিতযশা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব।
আইনজীবীরা জানান, এর আগে হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ বিভিন্ন মামলার রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন যে, সুনির্দিষ্ট বা কার্যকারিতা রয়েছে এমন কোনো নিয়মিত মামলা রেকর্ড না থাকলে কেবল প্রতিহিংসার বশে বা আইনি loopholes ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিকে বারবার শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এছাড়া বারবার রিমান্ডে নেওয়া, হেনস্তা করা কিংবা মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতির মুখে ফেলা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের একটি রুল জারি করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ও আপিল বিভাগের আদেশ
হাইকোর্টের ওই আদেশের পরপরই মাঠপর্যায়ের অপরাধ তদন্ত কার্যক্রম ও বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে দ্রুত লিভ টু আপিল বা স্থগিতাদেশের আবেদন করে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মতে, অনেক সময় চাঞ্চল্যকর ও বহুমুখী অপরাধের ঘটনায় মূল অপরাধীকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ বা অন্য মামলায় সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের জন্য শ্যোন অ্যারেস্টের আইনি সুযোগ অত্যন্ত জরুরি। হাইকোর্টের একপাক্ষিক বা সাধারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু জটিল মামলার তদন্ত কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উভয় পক্ষের দীর্ঘ আইনি যুক্তি ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শোনার পর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
তবে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মূল রুলটি আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি করার জন্য কঠোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
শ্যোন অ্যারেস্ট ও আইনি মারপ্যাঁচ: নেপথ্য প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ বা গ্রেফতার দেখানো অত্যন্ত পুরোনো একটি প্রক্রিয়া হলেও
এর অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলে আসছিলেন।
প্রচলিত নিয়মে, কোনো ব্যক্তি একটি মামলায় জামিন পাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বা কারাগار
থেকে বের হওয়ার প্রাক্কালে তাকে অন্য কোনো পুরোনো বা নতুন অজ্ঞাতনামা মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে আটকে রাখা হয়।
এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর আইনি জাঁতাকলে পিষ্ট হন এবং বারবার কারাবাসের শিকার হন।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাইকোর্টের মূল রায়টি মূলত নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার
একটি ইউনিক পদক্ষেপ ছিল। তবে অপরাধজগতের বহুস্তর বিশিষ্ট অপরাধীদের চক্র ভাঙতে
এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আইনের আওতায় আনতে তদন্তকারী সংস্থাগুলোরও কিছু আইনি পরিসরের প্রয়োজন হয়।
আজকের আপিল বিভাগের এই আদেশের ফলে আপাতত সেই দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিতর্কের অবসান না ঘটলেও,
আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টে রুল শুনানির মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ভাগ্য।
আইনি অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
আপিল বিভাগের এই আদেশের পর দেশের আদালত পাড়া ও আইনি মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
একদল আইনজীবী মনে করছেন, শ্যোন অ্যারেস্টের ওপর শিথিলতা আসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা স্বস্তি পাবে
এবং চাঞ্চল্যকর অপরাধের ক্লু উদ্ঘাটন সহজ হবে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশের মতে,
সুনির্দিষ্ট ভিত্তি ছাড়া কাউকে আটকে রাখার প্রবণতা রোধ করা না গেলে মৌলিক অধিকার রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে।
এখন সবার দৃষ্টি আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্ট বেঞ্চে হতে যাওয়া রুলের চূড়ান্ত শুনানির দিকে।
