১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হবিগঞ্জ যাওয়ার পথে বাহুবলে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দিয়েছে পুলিশ। প্রতিবাদে বৃষ্টির মধ্যেই সড়কে বসে পড়লেন নেতারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক, হবিগঞ্জ:
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন করে এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পুলিশের প্রাথমিক বাধা ও ব্যারিকেড উপেক্ষা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের বহর হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেও, শেষ পর্যন্ত জেলার বাহুবল উপজেলার প্রবেশমুখে তাদের আটকে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারির দোহাই দিয়ে এই বাধা দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে এবং পুলিশের এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে মুছাই এলাকার জনবহুল সড়কে বৃষ্টির মধ্যেই অবস্থান নেন এবং প্রায় এক ঘণ্টা ধরে রাস্তায় বসে থেকে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে হবিগঞ্জ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাহুবল উপজেলার মুছাই নামক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই নাটকীয় পরিস্থিতির অবতারণা হয়। গত কয়েক দিন ধরে চলা রাজনৈতিক কোন্দল, হামলা ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো জেলাজুড়ে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
শ্রীমঙ্গলের ব্যারিকেড ভেঙে উত্তপ্ত যাত্রা
এর আগে বুধবার বিকালের দিকে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউস থেকে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা ও নেতাকর্মীদের স্লোগানের মধ্য দিয়ে হবিগঞ্জের পথে রওনা দেয় এনসিপির একটি বড় গাড়িবহর। এই বহরে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতারা—যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন দলের আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ এমপি এবং সারোয়ার তুষারসহ আরও অনেকে।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে যখন এই গাড়িবহরটি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা-কন্যা এলাকায় পৌঁছায়, তখন স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন তাদের গতিরোধ করার চেষ্টা করে। তবে পুলিশের সেই প্রাথমিক ব্যারিকেড ও বাধা উপেক্ষা করে এনসিপির নেতারা নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং বহর সামনে চালিয়ে যান।
বাহুবলের মুছাইয়ে এসে পুলিশের কঠোর বাধা ও অবস্থান ধর্মঘট
শ্রীমঙ্গল পার হয়ে গাড়িবহরটি যখন হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার মুছাই এলাকায় প্রবেশ করতে যায়, তখন সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য তাদের পথ আটকে দেয়। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হবিগঞ্জ পৌর ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে কোনোভাবেই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এই মুহূর্তে জেলায় প্রবেশ করতে দেওয়া সম্ভব নয়।
পুলিশের এই কঠোর অবস্থানের মুখে পড়ে এনসিপির নেতারা গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। শত বাধা ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে তারা প্রকাশ্য রাজপথের ওপর বসে পড়েন। মুছাইয়ের ওই পিচ্ছিল ও ব্যস্ত সড়কে বৃষ্টির মাঝেই প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তারা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে প্রশাসনের এই ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
১৪৪ ধারা জারি ও বিজিবি মোতায়েন: নেপথ্যের কারণ
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে শহরজুড়ে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরের সাইফুর রহমান টাউন হলের সামনে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’র নির্ধারিত সভা শেষ করে সার্কিট হাউসে ফেরার পথে সবুজবাগ এলাকায় একদল স্থানীয় যুবকের হামলার শিকার হন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। বিশেষ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের ওপর চড়াও হওয়া হয় এবং তাদের বহনকারী গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা শহরের সোনালী ব্যাংক প্রধান শাখার ভেতরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, যাতে সারজিস আলমসহ অন্তত কুড়ি জন নেতাকর্মী আহত হন। পরে গভীর রাতে পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নেওয়া হয় এবং রাতেই তারা মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল এবং এনসিপির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ চরমে পৌঁছায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসন বুধবার সকাল থেকে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। পাশাপাশি জেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ৩ প্লাটুন বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) মোতায়েন করা হয়।
এনসিপি ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
পুলিশের বাধা এবং রাস্তায় বসে পড়ার এই ঘটনার পর এনসিপির উত্তরাঞ্চলের সংগঠক নাহিদ উদ্দিন তারেক সংবাদমাধ্যমের কাছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“আমাদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে হামলা চালানো হয়েছে।
আমরা এর প্রতিবাদে এবং জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলাম।
যেহেতু জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে, তাই আমরা আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে বিরত থেকেছি।
তবে সরকারের এই দমনপীড়ন ও জনরোষের বিষয়টি আমরা দেশের জনগণের সামনে উন্মোচন করতে চাই।
খুব শীঘ্রই প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের পরবর্তী অবস্থান ও বিস্তারিত জাতির সামনে তুলে ধরব।”অন্যদিকে,
স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা এই পুরো ঘটনার জন্য এনসিপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও রাজনৈতিক অপরিপক্বতাকে দায়ী করেছেন।
হবিগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সফিকুর রহমান সিতু এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “হবিগঞ্জ বরাবরই একটি শান্তপ্রিয় ও অতিথি পরায়ন শহর।
এখানকার মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো,
অতি অল্প সময়ে আত্মপ্রকাশ করা একটি নতুন রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের নামের প্রচারের জন্য দেশেরশীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রধানমন্ত্রী থেকে
শুরু করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে যেভাবে অত্যন্ত অশালীন ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা এখানকার সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি।”
তিনি আরও বলেন, “রাজনীতির ময়দানে সুস্থ সমালোচনা বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে,
কিন্তু শিষ্টাচার বহির্ভূত ভাষা ব্যবহার করলে স্থানীয় জনতা তা দীর্ঘ সময় সহ্য করবে না।
আমরা চাইনা শহরে কোনো ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলা ঘটুক, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত শালীনতার সীমা বজায় রেখে রাজনীতি করা।”
বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ
বাহুবলের মুছাইয়ে দীর্ঘ সময় বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা অবরোধ করে রাখার পর এনসিপির নেতারা পরবর্তীতে সেখান থেকে কর্মসূচি সমাপ্ত করে
ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গেছে। তবে এই ঘটনার জেরে সিলেট বিভাগীয় রাজনীতিতে নতুন এক উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল হক জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনোমামলা দায়ের করা হয়নি,
তবে পুলিশ সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে
যাতে নতুন করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা সহিংসতার জন্ম না হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন,
উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তির সাথে ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
