মতিঝিল শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানায় গুলশান থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ থেকে বহিস্কৃত নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আবারও আইনশৃঙ্খলার জালে আটকা পড়তে হয়েছে। বহু আলোচিত ২০১৩ সালের মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকার মহাসমাবেশকে ঘিরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জারীকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়েছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ দল তাকে সফলভাবে আটক করে। ডিবি পুলিশের শীর্ষপর্যায় থেকে এই আটকের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে একই দিনে আদালতের একটি হাজিরায় লতিফ সিদ্দিকী নিজেই গণমাধ্যমের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানার সুবাদে যেকোনো সময় তাকে বড় কোনো মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
শাপলা চত্বর হত্যা মামলা ও ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে ঢাকার মতিঝিলস্থ শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎকালীন অভিযানের সময় সংঘটিত প্রাণহানি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি বড় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া ও আইনি কার্যধারার অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনাল থেকে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে ওই ঘটনার নেপথ্য কুশীলব ও উসকানিদাতা হিসেবে যাদের নাম আলোচিত হয়ে আসছে, লতিফ সিদ্দিকী তাদের মধ্যে অন্যতম। ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানা হাতে পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে গুলশানের একটি নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয় এবং শাপলা চত্বরের ওই মানবতাবিরোধী মামলার আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আদালতের আঙিনা থেকে বেরিয়ে ফের শ্রীঘরে
এর আগে বুধবার সকালে ঢাকার একটি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অন্য একটি নিয়মিত মামলায় হাজিরা দিতে এসেছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপকালে তিনি দাবি করেছিলেন যে, তিনি কখনো আত্মগোপন করেন না এবং শাপলা চত্বরের মামলার বিষয়ে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা বা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না। এমনকি পুলিশ বা ট্রাইব্যুনাল থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার না করা হলে তিনি নিজেই আগামী সপ্তাহের শুরুতে ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
তবে তার সেই ইচ্ছার পূর্ণতা পাওয়ার আগেই দুপুরের পর বা বিকেলের দিকে ডিবির চৌকস টিম গুলশান এলাকা থেকেতাকে পাকড়াও করে।
আদালতের বারান্দা থেকে ফেরার পথেই তার এই নতুন গ্রেপ্তার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও লতিফ সিদ্দিকীর বিগত দিনগুলো
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পালাবদল ঘটে।
এর আগে গত বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ)
একটি গোলটেবিল আলোচনা সভায় অংশ নিতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হন লতিফ সিদ্দিকী।
সে সময় ‘জুলাই যোদ্ধা’ বা ক্ষুব্ধ জনতা তাকে অবরুদ্ধ করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছিল।
পরবর্তীতে শাহবাগ থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তাকে দীর্ঘদিন কারাবাস করতে হয়
এবং পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে টাঙ্গাইল অঞ্চল থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া
এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করা লতিফ সিদ্দিকী ২০১৩ সালের ওই ঘটনার পর থেকেই নানা বিতর্কের আবর্তে পড়েন।
২০১৪ সালে বিদেশে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে দেওয়া বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে এর আগেই তিনি মন্ত্রী ও দলথেকে ছিটকে পড়েছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শাপলা চত্বরের মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার গ্রেপ্তার আইনি জটিলতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিল বলেমনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
