অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার ৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তরুণদের ভুল নির্দেশনা ও সংস্কার নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
সংবাদ প্রতিবেদন: অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নীতিগত স্থবিরতা ও তরুণ প্রজন্মের গতিপ্রকৃতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সমগ্র জাতির বুকজুড়ে এক অভাবনীয় ও আকাশচুম্বী জনপ্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই আশাবাদের জায়গায় কতটা বাস্তবায়ন ঘটেছে এবং কোথায় রয়েছে বড় ধরনের গলদ, তা নিয়ে এখন বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক বিশেষ উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কড়া সমালোচনা করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বনামধন্য সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন পরিচালিত আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা কনসোর্টিয়াম ‘সোয়াস অ্যান্টি-করাপশন এভিডেন্স’-এর উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। সেখানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে বর্তমান প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বড় ধরনের ত্রুটি ও ব্যর্থতার তিনটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তুলে ধরেন তিনি।
আমলাতন্ত্রের সঙ্গে আপস এবং রক্ষণশীল পথ অনুসরণের চড়া মূল্য
একটি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর মৌলিক রূপান্তর ঘটানোর সুবর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন কেন তাতে পুরোপুরি হোঁচট খেয়েছে, তার চুলচেরা ব্যাখ্যা দেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তার সুচিন্তিত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন শুরু থেকেই কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং নিরাপদ পথ বেছে নেওয়ার নীতিতে অটল ছিল।
রাষ্ট্রের পুরোনো, মরচে পড়া এবং অকার্যকর আমলাতান্ত্রিক কাঠামো আমূল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে। কাঠামোগত সংস্কারের পথে না হেঁটে একই ধাঁচের এবং পুরোনো পন্থার আমলাদেরই রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদগুলোতে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ, কাঙ্ক্ষিত ও বিপ্লবী কোনো পরিবর্তনের বদলে কার্যত পুরোনো এবং জনবিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাই বহাল থেকে গেছে। আমলাতান্ত্রিক এই জটিল বলয়ের সঙ্গে সরকারের আপসকামিতা রাষ্ট্রসংস্কারের মূল গতিরোধে সবচেয়ে বড় প্রাচীর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল বলে মনে করেন এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ।
“অন্তর্বর্তী সরকার বুঝতে পারেনি কোন মুহূর্তে সাহসী ও মৌলিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তারা শুরু থেকেই রক্ষণশীল ও নিরাপদ পথ বেছে নেয়।” — ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সাবেক উপদেষ্টা।
তরুণদের ক্ষমতার মোহ ও সঠিক দিকনির্দেশনার চরম ঘাটতি
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও আশঙ্কাজনক দিকটি তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান অভিযোগ করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির লড়াকু সৈনিক তথা তরুণ সমাজকে সঠিক ও নৈতিক পথে পরিচালিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান প্রশাসন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মাঝে হঠাৎ করেই ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের অতিরিক্ত মোহ ও আকর্ষণ তৈরি হয়েছে।
ড. ইউনূসের সরকার যদি শুরু থেকেই এই উদ্যমী তরুণদের যথাযথ এবং দূরদর্শী দিকনির্দেশনা দিত, তবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। ফলশ্রুতিতে, তরুণদের মাঝে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক বিশাল শূন্যতা বা ঘাটতি আজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সমাজে ক্রমান্বয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষাকে গৌণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করার এক বিপজ্জনক ও অবক্ষয়ী প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, যা আগামী দিনের জাতীয় নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত অশনিসংকেত।
‘রিফ্রম গেম’ বা সংস্কার নিয়ে প্রহসন: কমিশনের সুপারিশ ডাস্টবিনে
বর্তমান প্রশাসনের সংস্কার কার্যক্রমের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন সাবেক এই তত্ত্বাবধায়ক উপদেষ্টা। তিনি পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেন যে, সরকার মুখে বড় বড় সংস্কারের বুলি আওড়ালেও বাস্তবে এর কোনো আন্তরিক প্রতিফলন দেখা যায়নি। প্রশাসন নিজেই নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল এবং সেই কমিশনগুলো দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যালোচনা শেষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুপারিশমালাও সরকারের টেবিলে জমা দিয়েছিল।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সরকার সেই সুপারিশগুলোর দিকে ন্যূনতম নজর দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি।
বরং সেগুলোকে সম্পূর্ণ অবহেলা করে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
দেশের সচেতন মহলের কাছে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল বা নিছক ‘রিফর্ম গেম’ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মন্তব্য করেনতিনি।
সংস্কারের মোড়কে এই প্রহসনমূলক কর্মকাণ্ড দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও বেশি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সাহসী সিদ্ধান্তের অভাব এবং ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার বেদনা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা যে ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল,
অন্তর্বর্তী প্রশাসন তার যথাযথ সদ্ব্যবহার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কোন ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ঠিক কতখানি সাহসী
এবং মৌলিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক, তা অনুধাবন করার দূরদর্শিতা বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ছিল না।
সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের রক্তঝরা দিনগুলোকে পুঁজি করে যে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটানো সম্ভব ছিল,
নমনীয় কূটনীতি ও নিরাপদ থাকার মানসিকতার কারণে সেই সোনালী সুযোগ আজ হাতছাড়া হতে বসেছে।
রাষ্ট্রমালিকানার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের বৈপ্লবিক মানসিকতা প্রয়োজন ছিল,
প্রশাসনের ভেতরে তার চরম আকাল লক্ষ্য করা গেছে।
দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা ও ভবিষ্যতের করণীয় রূপরেখা
‘সোয়াস অ্যান্টি-করাপশন এভিডেন্স’-এর এই আন্তর্জাতিক গবেষণামূলক আয়োজনে দেশের দুর্নীতি দমন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস
এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষে নানা ধরনের সুপারিশ তুলে ধরা হয়। গবেষকরা মনে করেন,
রাষ্ট্রে যদি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে কেবল কথার ফুলঝুরি বা প্রতীকী সংস্কার দিয়ে কাজ চলবে না।
বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের এই সাহসী ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন দেশের রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে সঠিক রাষ্ট্র গঠনে সম্পৃক্ত করতে
এবং প্রশাসনের কাঠামোগত স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে এই ধরনের গঠনমূলক সমালোচনার গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আগামী দিনে অন্তর্বর্তী প্রশাসন এই সকল সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের কার্যক্রমে কতটা গতি আনতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
