দেশে বেড়েই চলেছে হাম ও এর উপসর্গে শিশু মৃত্যুর মিছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে প্রাণ হারিয়েছে চার শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন।
মহামারি কিংবা ছোঁয়াচে বিভিন্ন রোগবালাইয়ের ছোবলে যখন জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে আমাদের কোমলমতি শিশুরা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের চিকিৎসকদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেশজুড়ে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে হাম (Measles) রোগ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান ও রোগবিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক আতঙ্কজনক ও হৃদয়বিদারক তথ্য।
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই হামের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় থাবা বসিয়ে চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিংবা উপসর্গ নিয়ে আরও চার নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যুর মর্মান্তিক সংবাদ নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই ধারাবাহিক শিশু মৃত্যুর ঘটনা কেবল শোকের নয়, বরং জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টার সংক্রমণ ও মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সরাসরি নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও, হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় আরও চার শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কেবল হামের উপসর্গজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণকারী শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৮ জনে।
এর পাশাপাশি, সুনির্দিষ্ট ও ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানো শিশুর সংখ্যা রয়েছে আরও ৯৬ জন। সবমিলিয়ে এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সরাসরি হাম এবং হামের উপসর্গজনিত বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মোট ৮৪৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গোটা দেশবাসীর জন্য এক অপূরণীয় ও বেদনাদায়ক ক্ষতি।
দৈনিক আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ও সুস্থতার চিত্র
গত ২৪ ঘণ্টার সার্বিক সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের চিকিৎসালয়গুলোতে রোগীর চাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সময়ে নতুন করে আরও ১১৫ জন শিশুকে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হাম রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর বাইরেও শুধুমাত্র হামের বিভিন্ন উপসর্গ বা জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে এসে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছে আরও ১ হাজার ২২ জন শিশু।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন করে ৯৪৬ জন শিশুকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরিভিত্তিতে ভর্তি করা হয়েছে। তবে স্বস্তির সামান্য খবর হলো, চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টা ও সেবার মানোন্নয়নের ফলে নির্ধারিত সময়ে যথাযথ চিকিৎসা শেষ করে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৮৮৬ জন শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারলে অনেক শিশুই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।
১৫ মার্চ থেকে অদ্যাবধি সামগ্রিক প্রাদুর্ভাবের বিস্তৃত রূপ
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে চলতি আগস্ট মাসের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত দেশব্যাপী সংগৃহীত ও সংকলিত তথ্য অনুযায়ী,
সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৩ জনের একটি বিশাল অংকে গিয়ে ঠেকেছে।
এর মধ্যে চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সুনির্দিষ্টভাবে মোট ১৬ হাজার ২৯৫ জন রোগীকে
নিশ্চিত হাম রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে
মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৬২০ জন শিশুকে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রেখে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
এর মধ্যে সফলভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন করে এবং সুস্থতার ছাড়পত্র পকেটস্থ করে বাড়িফিরে গেছেন ১ লাখ ৮ হাজার ২৮৩ জন শিশু।
বাকি রোগীরা এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
হাম রোগের প্রকৃতি এবং শিশুদের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম হলো অত্যন্ত দ্রুত ছোঁয়াচে এক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ,
যা মূলত বাতাসের মাধ্যমে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে খুব দ্রুত সুস্থ মানুষের শরীরে বিস্তার লাভ করে।
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় এই ভাইরাস তাদের ফুসফুস, চোখ এবং ত্বকে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ সর্দি, কাশি, উচ্চ মাত্রার জ্বর এবং গায়ে লালচে র্যাশ বা দানার মাধ্যমে এই রোগের উপসর্গ প্রকাশ পায়।
যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা না হয়,
তবে হামের কারণে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের ইনফেকশন বা তীব্র পুষ্টিহীনতার মতো প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বর্তমান সময়ে মারা যাওয়া শিশুদের বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে এই ধরনের মারাত্মক শারীরিক জটিলতা কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিরোধে জনসচেতনতা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের করণীয়
হামের ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর এইমিছিল রোধ করতে হলে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিকে আরও বেশি জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি এলাকার প্রতিটি শিশুর শরীরে হামের টিকা (Measles Vaccine) শতভাগ
নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
অভিভাবকদের প্রতি চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ হলো—শিশুর শরীরে যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিক জ্বর, সর্দি কিংবা গায়ে লালচে দানা বা র্যাশ
দেখা দিলেই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই রোগটিকে অবহেলা করা যাবে না।
পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রেখে অন্যদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে,
যাতে এর সংক্রমণ কোনোভাবেই চারপাশের অন্য সুস্থ শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
দেশের প্রতিটি শিশুর নিরাপদ ও সুস্থ শৈশব নিশ্চিত করতে সামাজিক সচেতনতা
এবং সরকারি নজরদারি আরও বেশি দৃঢ় করার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
