জ্বালানি নীতির পরিবর্তন ও অবকাঠামোগত অচলাবস্থায় বাংলাদেশে মারাত্মক গ্যাস সংকট। আড়াই হাজার কারখানা বন্ধ ও সার উৎপাদন ব্যাহত নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। দেশের শিল্প, কৃষি ও সার্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব স্থবিরতা। জাতীয় গ্রিডে তীব্র গ্যাস ঘাটতির কারণে সারা দেশে ইতোমধ্যে প্রায় ২,৫০০টিরও বেশি শিল্প ও পোশাক কারখানা নিজেদের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। একই সাথে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এবং গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় দৈনিক ১৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে সাধারণ মানুষ। নীতিগত সিদ্ধান্তের পরিবর্তন, বিকল্প অবকাঠামো তৈরিতে বাধা এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অনিশ্চয়তার ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন চরম হুমকির মুখে।
পরিসংখ্যান ও বাস্তবচিত্র: চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে সরবরাহ
বাংলাদেশের দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদা আনুমানিক ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
তবে এর বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে বর্তমানে মিলছে মাত্র ১,৬০০ থেকে ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা দিন দিন আরও হ্রাস পাচ্ছে।
২০১৭ সালে যেখানে দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক রেকর্ড ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত,
সেখানে ধারাবাহিক উত্তোলনের ঘাটতি মেটাতে পরবর্তীতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
[মোট দৈনিক চাহিদা: ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট]
│
├─► দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ: ১,৬০০ – ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট
└─► আমদানিকৃত এলএনজি (ঘাটতি পরবর্তী): ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট
─────────────────────────────────────────────────
[সর্বমোট প্রাপ্তি: ২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক ঘাটতি: ১,৭০০ মিলিয়ন)]
কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে থাকা দুটি ভাসমান রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনালের (FSRU) মাধ্যমে আগে দৈনিক সর্বোচ্চ ১,০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিকৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতো।
কিন্তু সম্প্রতি একটি প্রধান এফএসআরইউ-তে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ অর্ধেকেরও বেশি কমে মাত্র ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
বর্তমানে ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দেশ পাচ্ছে মাত্র ২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট,
যা মোটের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি করেছে।
কৃষি ও সার উৎপাদনে ধ্বংসাত্মক প্রভাব
গ্যাস সংকটের সরাসরি আঘাত এসে পড়েছে দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতের ওপর।
প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা গ্যাসের অভাব থাকায় দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই বর্তমানে তাদের স্বাভাবিক উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
কৃষি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব:
- সার আমদানির নির্ভরতা: সার কারখানাগুলো অচল হয়ে পড়ায় দেশের মোট ইউরিয়া সার চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই এখন বৈদেশিক আমদানির ওপর নির্ভর করছে।
- কৃষি মৌসুমে খাদ্য ঝুঁকি: দ্রুত এই সংকটের সামাধান না হলে আগামী সেচ ও চাষের মৌসুমে কৃষকেরা চরম সার সংকটে পড়তে পারেন, যা চাল ও অন্যান্য ফসলের জাতীয় উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
- সিএনজি ও যাতায়াত ব্যবস্থা: সিএনজি পাম্পগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সড়কে যানবাহন চলাচল কমে গেছে, যা সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় ও দুর্ভোগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাতিলকৃত অবকাঠামো ও নীতিগত বিতর্ক
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন, কেবল আকস্মিক দুর্ঘটনাকে এই জাতীয় সংকটের একক কারণ হিসেবে দেখা যায় না।
ব্যাকআপ বা বিকল্প অবকাঠামোর অভাবই মূলত এই দুর্ঘটনাস্থলকে এক জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ দিয়েছে।
| অবকাঠামোগত উদ্যোগ | সিদ্ধান্ত ও বর্তমান স্থিতি |
| তৃতীয় এফএসআরইউ (FSRU) প্রকল্প | সামিট গ্রুপের সাথে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতার চুক্তিটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন বাতিল করে। |
| এলএনজি সরবরাহ চুক্তি বাতিল | অবকাঠামো না থাকার দোহাই দিয়ে পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামিটের সাথে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি আমদানি চুক্তিও স্থগিত করা হয়। |
| একক লাইফলাইন | এক্সিলারেটের টার্মিনাল বিকল হওয়ার পর বর্তমানে সামিটের পুরোনো এফএসআরইউ-টিই জাতীয় গ্রিডের একমাত্র এলএনজি লাইফলাইন হিসেবে চালু রয়েছে। |
যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃতীয় টার্মিনালটির নির্মাণ শেষ হতো,
তবে একটি ঘাটে যান্ত্রিক ক্রুটি দেখা দিলেও তা পুরো দেশের জ্বালানি খাতের ওপর এমন মারাত্মক চাপ তৈরি করতে পারতো না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
বৈদেশিক চুক্তি ও আর্থিক ব্যয়ের খতিয়ান
বিদ্যমান মার্কিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি ‘ফোর্স মেজিউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির অজুহাতে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কার্গো সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ার পরও,
আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে চড়া মূল্যে নতুন বেসরকারি বিদেশি কোম্পানির সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি ‘গুণভোর ইউএসএ এলএলসি’ (Gunvor USA LLC)-এর সাথে ১৩ বছরের মেয়াদে ৭৮টি এলএনজি কার্গো আমদানির এক প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে,
যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭১৪.৯৫ বিলিয়ন টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত বিশ্ববাজার মূল্যের তুলনায় এই চুক্তিতে অতিরিক্ত প্রায় ১৮০ বিলিয়ন টাকা বেশি ব্যয় করা হচ্ছে।
তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মূল উৎপাদকদের সাথে সরাসরি চুক্তি না করে মধ্যস্থতাকারী বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া দেশীয় অর্থব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করছে।
দূরদর্শিতার অভাব নাকি কৌশলের ভুল?
বাংলাদেশের শিল্প খাত যখন ধুঁকছে এবং দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি ঘাটতি নিয়ে কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে,
তখন জ্বালানি খাতের এই নীতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক হুমকি সৃষ্টি করছে।
সংকীর্ণ বিদেশি সরবরাহকারী গোষ্ঠীর ওপর একক নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো সম্প্রসারণে স্থবিরতা দেশের পুরো জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক ভঙ্গুর কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্তরে বাণিজ্যিক কূটনীতি বজায় রাখার পাশাপাশি দেশের ভেতরের প্রকৃত চাহিদা ও বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প খাতের এই স্থবিরতা খুব শীঘ্রই অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জনস্বার্থ এবং শিল্পকে বাঁচাতে অবিলম্বে এই জ্বালানি নীতি ও অবকাঠামোগত চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
