৫ই মে ২০১৩ শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান ধর্মের দাবির চেয়ে বেশি ছিল একটি চরমপন্থী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এই বিশ্লেষণে উন্মোচিত হয়েছে জামায়াত-হেফাজতের যৌথ কৌশল ও এর ভয়াবহ প্রেক্ষাপট।
বিশ্লেষনঃ ৫ মে ২০২৫
শাপলা চত্বর, ৫ মে ২০১৩: ধর্মের মুখোশে একটি চরমপন্থী ষড়যন্ত্র
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে শুরু হয় এক নজিরবিহীন গণআন্দোলন। ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামে পরিচিত সেই আন্দোলনে লক্ষ লক্ষ মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে। সরকার এই চাপে পড়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

এই সময়ে জামায়াতে ইসলামী, যারা সরাসরি যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত নেতাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, বুঝতে পারে রাস্তাঘাটে নামা ছাড়া তাদের বাঁচার পথ নেই। কিন্তু নিজেদের নামে রাজপথে নামলে গণবিরোধী প্রতিক্রিয়া আসবে, তাই তারা বেছে নেয় ‘ধর্ম’কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার পথ।
হেফাজত: ধর্মীয় সংগঠন না রাজনৈতিক ছদ্মবেশ?
এই পরিপ্রেক্ষিতে আবির্ভূত হয় হেফাজতে ইসলাম। তারা নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিলেও মূলত তারা জামায়াতের নতুন স্ট্র্যাটেজিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। তাদের ১৩ দফা দাবি ধর্মীয় রং চড়ানো হলেও প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা এবং সরকার উৎখাত।
তাদের দাবির মধ্যে ‘নাস্তিক ব্লগারদের’ বিচার, নারীর অধিকারবিরোধী বক্তব্য, ইসলামবিরোধী লেখালেখির শাস্তির দাবি ছিল স্পষ্টতই সাংবিধানিক ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। এসব দাবি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী।

৫ মে’র পরিকল্পনা: সরকার পতনের ষড়যন্ত্র;
২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজত সরকারের কাছ থেকে শাপলা চত্বরে অবস্থান করার অনুমতি নেয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হলেও, পরবর্তীতে তারা জানিয়ে দেয় যে তারা জায়গা ছাড়বে না। উদ্দেশ্য ছিল রাতভর অবস্থান করে সরকার পতনের প্রক্রিয়া শুরু করা, একদম আরব বসন্ত কায়দায়।
রাত বাড়ার সাথে সাথে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণভাবে অভিযান চালিয়ে রাতের মধ্যেই শাপলা চত্বর খালি করে।


‘গণহত্যা’ গুজব: তথ্য-যুদ্ধে জামায়াতের কৌশল;
পরের দিন সকাল থেকেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে— আড়াই হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং লাশ বঙ্গোপসাগরে ফেলা হয়েছে! অথচ এই অভিযোগ আজ পর্যন্ত কোনও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন BBC, Al Jazeera, Human Rights Watch দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। বরং গুজব ছড়ানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করা এবং জামায়াত-হেফাজত জোটের ষড়যন্ত্র আড়াল করা।
প্রকৃত সহিংসতা: পরদিন হেফাজতের তাণ্ডব;
৫ মে অভিযান সফল হলেও, ৬ মে সারাদেশে হেফাজত ও জামায়াত কর্মীরা সহিংস তাণ্ডব চালায়। আগুন দেওয়া হয় পুলিশ ফাঁড়ি, সরকারি স্থাপনা, এমনকি বইমেলাও রক্ষা পায়নি। কমপক্ষে ২৮ জন নিহত হন, যার মধ্যে পুলিশ সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষও ছিলেন।


প্রশ্ন রয়ে যায়;
যদি হেফাজতের ১৩ দফা দাবিই ছিল ইসলামী মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত, তাহলে বর্তমান সরকারের সাথে হেফাজতের সম্পর্ক মধুর হওয়ার পর সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের কোনও কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না কেন?
উত্তর সহজ— কারণ সেই ১৩ দফা ছিল একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মোড়ক মাত্র।
শেষকথা:
৫ মে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাটি ছিল ধর্মের নামে একটি চরমপন্থী রাজনৈতিক অপচেষ্টা, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্র ভেস্তে যাওয়ায় বাংলাদেশের ইতিহাস এক ভয়াবহ মোড় থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
