সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম প্রেক্ষাপটে একটি নতুন শব্দজোয়ার আমাদের চোখে পড়ছে—‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ম্যাজিক’। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমনকি কিছু টেলিভিশন বিশ্লেষক দাবি করছেন, দেশের অর্থনীতি একধরনের অদ্ভুত গতিতে উন্নতি করছে। তবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই কথাগুলো মূলত বাস্তব অবস্থা থেকে জনগণের দৃষ্টি ফেরানোর একটি চেষ্টামাত্র।
অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বেশ জটিল এবং সংকটময়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, গণমাধ্যমে প্রচারিত অর্থনৈতিক ‘ম্যাজিক’ আসলে বিভ্রান্তিকর এবং অনেকাংশে তথ্যবিকৃতি।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের হার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি মুডিস পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের আউটলুক ‘নেতিবাচক’ বলে উল্লেখ করেছে। এটি মূলত সম্পদের ঝুঁকি এবং আর্থিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ।
পুঁজিবাজারেও একই রকম দুরাবস্থা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক ২০২৪ সালে প্রায় ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন, বিদেশি বিনিয়োগ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যক্তিখাতের ঋণপ্রবাহের হারও কমছে, যার অর্থ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।
জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নেট বিক্রয়ও ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রতিফলন। মানুষ এখন সঞ্চয় না করে প্রয়োজন মেটাতে সঞ্চয় ভাঙিয়ে খাচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে জনগণের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী। এমন বাস্তবতায় ‘ম্যাজিক’ শব্দটি ব্যবহৃত হওয়া প্রশ্নবিদ্ধ।
রিজার্ভের সামান্য বৃদ্ধি বা কিছু আন্তর্জাতিক মন্তব্যকে out-of-context তুলে ধরা হয়ে ওঠে বিভ্রান্তিকর। অর্থনীতি মানে শুধু রিজার্ভ নয়, বরং জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান, ও জনগণের মানবিক উন্নয়নই আসল সূচক।
এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা, ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। ‘ম্যাজিক’ শব্দ দিয়ে জনগণকে আনন্দে রাখা যায়, কিন্তু বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
