সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার সেনা দরবারে বলেন, “আমার কোনো অভিভাবক নেই, তোমরাই আমার অভিভাবক।” মানবিক করিডোর ইস্যুতে তার কঠোর অবস্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে উত্তেজনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষণ।
২১ মে সকালে সেনাসদস্যদের উদ্দেশ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সরাসরি ভাষণে যে বক্তব্য উঠে এলো, তা শুধু একটি সামরিক দরবারের বক্তব্য নয়—তা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামরিক বাস্তবতার এক স্পষ্ট রূপরেখা।
“আমার কোনো অভিভাবক নেই, তোমরাই আমার অভিভাবক” — এই একবাক্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অনির্বাচিত সিভিল প্রশাসনের চেয়ে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীন ঐক্য এবং জনগণের প্রত্যাশাই তাঁর প্রধান ভিত্তি।
মানবিক করিডোর ইস্যু, রাখাইনে আরাকান আর্মিকে ঘিরে গোপন সমঝোতা এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে খলিলুর রহমান ওরফে রজার রহমানের বিতর্কিত নিয়োগ—এই তিনটি ফ্যাক্টর সামরিক সদর ও অন্তর্বর্তী সরকারের মাঝে একটি স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এক জন সামরিক বাহিনীর বাইরে থাকা ব্যক্তি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার আসনে বসেন, যার ব্যাকড্রপে ছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ।
এরপর থেকেই যমুনা, বঙ্গভবন ও সেনাসদরে গুঞ্জনের ঝড় বইতে থাকে। সেনাবাহিনী মনে করে, তাদের পাশ কাটিয়ে আন্তর্জাতিক প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া ও মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করা, জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী এবং অগ্রহণযোগ্য।
আজকের দরবারে সবচেয়ে গর্জনধ্বনির মতো উচ্চারিত বাক্য ছিল: “নো ব্লাডি করিডোর বিজনেস।” জেনারেল ওয়াকার মানবিক করিডোর নিয়ে শুধু আপত্তিই তোলেননি, বরং এটিকে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের রাজনৈতিক চুক্তি হিসেবে আখ্যা দেন।
তাঁর অবস্থানে তিন বাহিনীর প্রধান, সিনিয়র অফিসার এবং মাঠ পর্যায়ের সেনাসদস্যরা অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। এতে পরিষ্কার যে, এই ইস্যুতে সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ঐক্যবদ্ধ।
সেনাবাহিনী প্রকাশ্যেই বলেছে—জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে সেনাবাহিনীকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। একথা শুধু ক্ষোভ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও সুশাসনের প্রশ্নও। যে সরকার অন্তর্বর্তী এবং অনির্বাচিত, সে সরকারের সীমারেখা অতিক্রম করা শুধু অনৈতিক নয়, তা বিপজ্জনকও।
সেনাপ্রধানের স্পষ্ট বক্তব্য—“ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই।” জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই হবে সিদ্ধান্তদাতা—এই অবস্থান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক কঠিন বার্তা।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীর উত্থান, ভাস্কর্য ধ্বংস এবং ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টায় সেনাবাহিনী নতুন করে ক্ষুব্ধ হয়েছে। কমান্ডিং অফিসাররা বলছেন—“মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে কোনো আপস নয়।” অর্থাৎ জাতীয় আত্মপরিচয় ও মর্যাদাকে যে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করলে সেনাবাহিনী তা আর নীরবে সহ্য করবে না।
সেনাপ্রধান বলেন, “অনেক ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখানো হয়েছে, এখন আর নয়।” মব সন্ত্রাস ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর মনোভাব যে আগের চেয়ে কঠোর হবে, তা স্পষ্টতই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এই মুহূর্তে সেনাবাহিনীর ঐক্য, দৃঢ়তা ও জনগণের আস্থা তাদের এক নতুন ভূমিকায় আহ্বান জানাচ্ছে। “আমার কোনো অভিভাবক নেই, তোমরাই আমার অভিভাবক” — এই বাক্যে রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী ও জনগণের সম্পর্কের এক নতুন সংজ্ঞা রচিত হলো।
সেনাবাহিনীর এই দরবার নিছক একটি “ইভেন্ট” নয়—এটি বাংলাদেশের রাজনীতি, নিরাপত্তা কাঠামো ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি।
একদিকে অনির্বাচিত, অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের সীমা অতিক্রম করার প্রবণতা, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর সংযমশীল ও সংবিধানভিত্তিক অবস্থান—এই দুইয়ের সংঘাত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা ভবিষ্যতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
