প্রধান বিচারপতির সেনা হেফাজতে থাকার প্রেক্ষিতে ‘পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রেফারেন্স’ কতটা স্বাধীন ছিল? ইউনূস সরকারের বৈধতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। বিশ্লেষণ করলেন দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে—কে তৈরি করেছিল সেই ‘পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রেফারেন্স’, যার ভিত্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার আজ রাষ্ট্র চালাচ্ছে? এবং এই সরকার গঠনের বৈধতা কীভাবে এবং কাদের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলো?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে দেশের প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান সেনাবাহিনীর আশ্রয়ে ছিলেন—এই তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তঃসেনাবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। অথচ সেই একই বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাত সদস্যের 'পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ' ভার্চুয়ালি একটি রেফারেন্সে সরকারের বৈধতা দিয়েছে—যা আজ ড. ইউনূস সরকার প্রতিষ্ঠার পাথেয়।
এই সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। যদি একজন প্রধান বিচারপতি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকেন, তবে তার দেয়া রেফারেন্স আদৌ কি স্বাধীন? না কি এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি ‘institutional endorsement’, যেখানে বিচার বিভাগকে ব্যবহৃত হয়েছে সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় একটি ‘quasi-constitutional’ সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য?
রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চেয়েছিলেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই রেফারেন্স তৈরির সময় প্রধান বিচারপতির অবস্থান এবং মানসিক অবস্থা কতটা স্বাধীন ছিল? রেফারেন্সটি ছিল একটি জরুরি পরিস্থিতিতে ‘নেসেসিটি ডকট্রিন’-এর প্রয়োগ, যার বৈধতা নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
আইনজ্ঞদের মতে, কোনো নির্বাচিত সংসদ ছাড়াই এমন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদাহরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
যদি এ রকম সিদ্ধান্ত কোনোভাবে সেনা তত্ত্বাবধানে গৃহীত হয়ে থাকে, তবে সেটা একটি “কোয়াসি-মিলিটারি ক্যু”-এর প্রতিচ্ছবি নয় কি?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারপতিরা স্বাধীন। কিন্তু প্রধান বিচারপতির সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অবস্থান এবং পরবর্তীতে তার পদত্যাগ (১০ আগস্ট ২০২৪) এই স্বাধীনতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর রাস্তায় চাপ এবং ইউনূসপন্থী গ্রুপগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক তৎপরতা এই পদত্যাগের পিছনে ভূমিকা রেখেছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ড. ইউনূস সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা পেয়েছে, যা তাদেরকে পুলিশি গ্রেপ্তারসহ বিচার বহির্ভূত ক্ষমতা দিয়েছে। এই ধরণের অপ্রথাগত ক্ষমতা প্রদান সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যদিও রাষ্ট্রপতির অধীনে কাজ করার কথা বলেছেন, তবে কার্যত সেনাবাহিনীর ক্ষমতার পরিধি আজ রাজনীতির কেন্দ্রে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হওয়া উচিত নির্বাচন আয়োজন এবং আইন-শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন। কিন্তু ড. ইউনূসের সরকার এখন নির্বাচন না করে ‘সংস্কারমুখী প্রশাসন’ চালাচ্ছে, যা স্বৈরাচারী প্রবণতার শঙ্কা সৃষ্টি করছে। অতীতে ফখরুদ্দীন সরকারের অনুরূপ দৃষ্টান্ত থাকলেও, তৎকালীন সরকার স্পষ্টভাবে নির্বাচন ঘোষণার রূপরেখা দিয়েছিল।
ড. ইউনূসের সরকার সেই স্পষ্টতা এখনো দেখাতে ব্যর্থ, বরং ‘সংস্কার’ নামক এক রহস্যময় পথে হাঁটছে।
