সেন্ট মার্টিন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিস্ফোরক মন্তব্যে উত্তাল বাংলাদেশ। ইউনূসের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষণ করলেন আমাদের প্রতিবেদক।
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে সেন্ট মার্টিনের গুরুত্ব নতুন নয়, তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসে দ্বীপটি আবারো জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এবারের বিতর্কের কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অডিও বার্তা—যেখানে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন, অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমেরিকার কাছে সেন্ট মার্টিন তুলে দিতে চাইছেন।
একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ১৯৭৫ সালের ঘটনা, যেখানে তিনি দাবি করেন—”আমার বাবা আমেরিকাকে সেন্ট মার্টিন দিতে রাজি হননি, তাই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে।”
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শেখ হাসিনার অডিও বার্তাটি যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। যেখানে তিনি বলেন, ইউনূস ক্ষমতায় এসেই দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছেন। অডিওর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে সেন্ট মার্টিনকে “মানবিক করিডর” হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার চেষ্টা করছেন ইউনূস, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে ইউনূস বিরোধী জনমত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, তরুণ প্রজন্ম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নতুন করে আলোচনা শুরু করেছেন:
‘বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিদেশি শক্তির প্রবেশ কি আসলেই ঘটতে চলেছে?’
সেন্ট মার্টিন শুধুই একটি পর্যটন দ্বীপ নয়, এটি বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, যার অবস্থান সামুদ্রিক নৌপথের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দ্বীপে গোপন ঘাঁটি তৈরি হলে তা ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এক বড় সুবিধা হতে পারে।
২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি আমলে এমন আলোচনার জন্ম হয়েছিল যে, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সেন্ট মার্টিনে সামরিক ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা চলছিল। যদিও সে সময় তা বাস্তবায়িত হয়নি। শেখ হাসিনা দাবি করছেন, ইউনূস এখন নতুন রূপে সেই একই পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি করতে চাইছেন।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ড. ইউনূস তাঁর সরকারবিরোধী অবস্থান এবং এনজিও-নির্ভর ‘সুশীল জোট’ গঠনের মাধ্যমে দেশে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে চাইছেন।
কিন্তু হাসিনার ‘স্মৃতিচারণামূলক মাস্টারস্ট্রোক’ তার রাজনৈতিক অবস্থানকে টলিয়ে দিয়েছে।
গত একবছর ধরে দেশ থেকে বাইরে অবস্থান করেও হাসিনা যেভাবে একের পর এক বার্তায় দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছেন, তা এই মুহূর্তে ইউনূসের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও ‘সেন্ট মার্টিন’ ইস্যুতে জনতার আবেগকে কেন্দ্র করে তিনি যে জাতীয়তাবাদী তরঙ্গ তুলেছেন, তা ইউনূসের “বৈষম্য বিরোধী জোটের” জনপ্রিয়তাকে একরকম ম্লান করে দিয়েছে।
‘মার্চ ফর ইউনূস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ইউনূসপন্থী শক্তি ঢাকা শহরে যে জনমত গঠনের চেষ্টা করেছিল, তা বাস্তবে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি। র্যালি শেষে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি করেও আশানুরূপ জনসমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়নি।
উল্টো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ জনগণ ‘সেন্ট মার্টিন রক্ষা’ ও ‘বিদেশি আগ্রাসন প্রতিরোধ’ স্লোগানে রাস্তায় নেমেছেন।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যেভাবে রূপ নিচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, সেন্ট মার্টিন একটি প্রতীক—শুধু ভূখণ্ডের নয়, বরং সার্বভৌমতা ও নেতৃত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের। শেখ হাসিনা এই প্রতীককে কেন্দ্র করেই এক জাতীয় আবেগ সৃষ্টি করতে সফল হয়েছেন, যেটি দীর্ঘ মেয়াদে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ইউনূসকে কেন্দ্র করে বিরোধী ঐক্য গড়ার প্রচেষ্টা যতই থাকুক, বাস্তবতা হলো—যে নেতা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন, তিনিই এখন জনমানসে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছেন।
