ইউরোপীয় চারটি সংগঠনের এক যৌথ চিঠিতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন ও সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছয় দফা পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ প্রতিনিধি কায়া কালাসের কাছে চারটি ইউরোপীয় সংগঠনের এক খোলা চিঠি আবারও বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ইউরোপীয় বাংলাদেশ ফোরাম (ইইউ ও গ্রেট ব্রিটেন), সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম (বেলজিয়াম), ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ (জার্মানি), এবং আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক (তুরস্ক) স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে যে বাস্তবতা ফুটে উঠেছে তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও এক কঠিন নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নাম উল্লিখিত, তবে চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী তার নেতৃত্বেই ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে আঘাত আসছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে বিরোধী কণ্ঠ দমন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণে।
গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান রীতিমতো আতঙ্কজনক। ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত ৩৫৬টি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। শাহরিয়ার কবিরের মত বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মীকে মিথ্যা মামলায় আটক করে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা স্পষ্টত মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপর হামলা এবং ১,৫০০টির বেশি ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ধ্বংস করার ঘটনায় বাংলাদেশকে তালেবান বা আইএসআইএল-প্রভাবিত অঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করেছেন চিঠির প্রণেতারা। জাতির পিতার বাসভবন এবং সংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলার মাধ্যমে ইতিহাস ও পরিচয় মুছে ফেলার এক ভয়ঙ্কর প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হচ্ছে।
আইনজীবী তুরিন আফরোজসহ ৬৪ জন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে আইনি ভীতি ছড়ানো হয়েছে। এমনকি মানবাধিকার আইনজীবী রামেন রায় পর্যন্ত হামলার শিকার হচ্ছেন। সাংবাদিক মেঘনা আলমের অপহরণ এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকের ঘটনা এ ধরনের দমননীতিরই অংশ।
হিন্দু, খ্রিস্টান ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের উপর হামলার সংখ্যা বেড়েছে। এ হামলার পেছনে রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে ইসলামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনঃউত্থান একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১২ মে ২০২৫ তারিখে আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, যা হেফাজত বা জামায়াতের মতো গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
চিঠিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ছয়টি কার্যকর পদক্ষেপের অনুরোধ জানানো হয়েছে:
১. রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা,
২. স্বাধীন তদন্তের দাবি,
৩. গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা,
৪. গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ,
৫. মানবিক সহায়তা প্রদান,
৬. কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হস্তক্ষেপ না করলে বাংলাদেশ রক্তক্ষয় ও চরম অস্থিরতার দিকে ধাবিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন তারা নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
✉️ চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিত্বরা
- ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন (ইইউ বাংলাদেশ ফোরাম, ইউকে)
- পাওলো কাসাকা (সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম, বেলজিয়াম)
- ক্লাউস স্ট্রেম্পেল (ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ, জার্মানি)
- তারিক গুনারসেল (আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক, তুরস্ক)
বাংলাদেশ এখন এক সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। একদিকে রাজনৈতিক শূন্যতা, অন্যদিকে চরমপন্থী শক্তির উত্থান—সব মিলিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ।
ইউরোপীয় সংগঠনগুলোর এই চিঠি শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘনের দলিল নয়, বরং আন্তর্জাতিক নৈতিকতার পরীক্ষাও বটে।
বিশ্ব সম্প্রদায় যদি নিরব থাকে, তবে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়—গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিশ্বব্যবস্থার জন্যই একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে।
