লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ উদ্দিন রাজনকে পুলিশ গ্রেপ্তারের পর উত্তাল জনতা তাকে ছিনিয়ে নেয়। স্থানীয়দের দাবি, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ঘটনাটি কি প্রশাসনের অপব্যবহার, নাকি আইনের প্রতি জনগণের অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ?
লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের এক শান্তিপূর্ণ সকাল হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে যখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন রাজন ওরফে রাজুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অথচ এই গ্রেপ্তার মুহূর্তেই সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী-পুরুষ মিলে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং অবিশ্বাস্যভাবে তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যান।
প্রশ্ন উঠেছে—কেন একজন গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি, যিনি ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানে অভিযুক্ত হিসেবে পুলিশের হাতে আটক হন, তাকে জনগণ এতটা সমর্থন করলো যে, তারা আইনকে পাশ কাটিয়ে তার মুক্তি নিশ্চিত করলো?
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, আশরাফ উদ্দিন রাজন একজন সৎ, দানশীল, এবং জনদরদী নেতা। তিনি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের মধ্যেই জনপ্রিয় নন, দল-মত নির্বিশেষে জনসাধারণের প্রিয় একজন প্রতিনিধি। তাকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জনগণের যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা সাধারণ নয়।
তারা দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি, মাদক সংযোগ বা সন্ত্রাসের অভিযোগ নেই। বরং তিনি এলাকায় মাদকবিরোধী আন্দোলনের এক পরিচিত মুখ। তাহলে কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হলো?
এই প্রশ্নের জবাবে অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে আখ্যা দেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি তিনি দলের ভেতর একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, যার ফলে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও দমননীতির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন সমর্থকেরা।
কমলনগর থানার ওসি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, পুলিশের টার্গেট ছিল মাদক মামলার এক আসামি। কিন্তু ঘটনাস্থলে আশরাফ উদ্দিনকে দেখে তাকে ‘ডেভিল হান্ট’ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। এখানেই দেখা দেয় প্রশ্ন
—এই অভিযানে তার নাম কেন সামনে এল? তাকে গ্রেপ্তারের পেছনে গোয়েন্দা তথ্য ছিল, নাকি এটি ছিল একটি পূর্ব-পরিকল্পিত চক্রের অংশ?
স্থানীয়দের প্রতিবাদের ধরন এবং ব্যাপকতা বুঝিয়ে দেয়, এই গ্রেপ্তারকে তারা কোনোভাবেই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ বলে মনে করেননি। বরং এটিকে তারা নিজেদের সামাজিক নেতৃত্বের উপর ‘আক্রমণ’ হিসেবে দেখেছেন।
একজন হ্যান্ডকাফ পরা আসামিকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এক ভয়ংকর উদাহরণ। এটি পুলিশের জন্য অপমানজনক এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তবে এর বিপরীতে যদি জনগণের এত বিপুল সমর্থন সত্যিই তার নির্দোষতার প্রমাণ হয়, তাহলে এর গভীরে রাজনৈতিক অবিচারও লুকিয়ে থাকতে পারে।
এই দ্বৈত বাস্তবতা আমাদের সামনে এক নতুন প্রশ্ন হাজির করে—জনগণের ভালোবাসা কি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে? নাকি রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতাই জনতাকে এই পথে বাধ্য করছে?
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
যদি আশরাফ উদ্দিন সত্যিই নির্দোষ হন, তাহলে এই গ্রেপ্তার ছিল রাজনৈতিক অপব্যবহার। অন্যদিকে, যদি তার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রমাণ থাকে, তবে জনগণের এমন আইন লঙ্ঘন ভবিষ্যতের জন্য ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে।
তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। প্রয়োজনে এই গ্রেপ্তারের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখা উচিত। অন্যথায় এমন নজির আরও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে।
