সংবাদ মাধ্যম রয়টার্সের এক বিবৃতি তে-অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকার শিক্ষক আন্দোলন, বেসামরিক প্রশাসনের অসন্তোষ ও সামরিক চাপের মুখে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষণ করলেন বিশেষ প্রতিবেদক।

বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়কাল যেন এক নতুন ‘সিস্টেম ট্রানজিশন’-এর উন্মোচন করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ৯ মাসের মাথায় নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রশাসনকে ইতিহাসের অন্যতম জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মোকাবেলায় ফেলেছেন।
২৬ মে পর্যন্ত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে স্পষ্ট হয়, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বর্তমানে চারমুখী চাপের মুখে—বেসামরিক প্রশাসন, শিক্ষাখাত, রাজনীতি এবং সেনাবাহিনী—এই চার স্তম্ভ থেকেই তাঁর সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষক ২৬ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের ‘ছুটি’ ঘোষণা করেছেন। তারা শুধু বেতন বৃদ্ধির দাবিই জানাচ্ছেন না, সরকারের সদ্য প্রণীত অধ্যাদেশ—যার ফলে সরকারী কর্মচারীদের সহজেই বরখাস্ত করা সম্ভব—তাকে ‘দমনমূলক’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বলা বাহুল্য, এ ধরনের কর্মসূচি কেবল একক দাবি নয়; বরং ইউনূস সরকারের কার্যধারার ওপর সামাজিক আস্থা হারানোর ইঙ্গিত বহন করছে।
২৫ মে জারি করা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধ্যাদেশটিই হয়ে উঠেছে এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু। এতে বলা হয়, অসদাচরণের অভিযোগে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছাড়াই বরখাস্ত করা যাবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত আমলাতন্ত্রকে ক্ষুব্ধ করেছে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধারাবাহিক বিক্ষোভ শুরু হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে সরকারকে কর বিভাগ ভেঙে নতুন বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হয়। এটি একপ্রকার প্রশাসনিক আত্মসমর্পণ বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ ও নতুন গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ ইউনূস প্রশাসনের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। সদ্য এক ছাত্র নেতার বক্তব্যে যখন বলা হয়, সরকার সংস্কার ও নির্বাচনের সময়সূচী ঘোষণা না করলে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে—তখনই ইউনূস ইঙ্গিত দেন, তিনি পদত্যাগ করতে পারেন।
তবে তার ঘনিষ্ঠ পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সেই জল্পনাকে নাকচ করে বলেন, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকব।”
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা এসেছে দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কাছ থেকে। গত সপ্তাহে তিনি প্রকাশ্য ভাষণে বলেছেন, ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। এটি এক প্রকার ‘শেষ তারিখ’ হিসেবে গণ্য করছে অনেকে।
সামরিক নেতৃত্বের এই অবস্থান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর এক ধরনের অলিখিত আল্টিমেটাম হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
২৫ মে এবং ২৬ মে ইউনূস তাঁর উপদেষ্টা পরিষদকে ডেকে শেষ মুহূর্তে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সমঝোতার পথ খুঁজছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “আমরা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে আছি।”
এপ্রিলে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। এর ফলে দলটি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এটি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিকে পেছনে ঠেলে দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে একমুখী করে তুলেছে। তবে একে একঘরে করেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যাবে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে নতুন করে।
ইউনূস প্রশাসন এখন এক দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন—একদিকে দ্রুত সংস্কার ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের চাপ, অন্যদিকে নানা পক্ষের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের দায়। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করার ইউনূসের প্রস্তাব জনমনে গ্রহণযোগ্যতা হারাতে বসেছে, যেখানে রাজনৈতিক দল ও সামরিক বাহিনী ডিসেম্বরেই নির্বাচন চায়।
বর্তমান বাস্তবতায় বলা যায়, যদি এই চারমুখী চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয় ইউনূস প্রশাসন, তবে বাংলাদেশ আরেকটি গভীর রাজনৈতিক মোড় নিতে পারে।
