ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক ভূমিকা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক আচরণ এবং ২০২৪ নির্বাচনের সময়ে নিরবতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। বিশ্লেষণ থাকছে এই কলামে।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য করে আসছে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন গোষ্ঠীর দিকে আঙুল উঠছে—ছাত্রশিবির। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা সম্প্রতি এক ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেছেন,
ছাত্রশিবির দেশের ছাত্ররাজনীতির পরিবেশকে টক্সিক করে তুলেছে।
তিনি সরাসরি দাবি করেন, শিবিরের সদস্যরা এতদিন ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের “নিষ্পাপ” হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছেন, অথচ এখন তারাই নিজেদের ভিন্নধারার শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে।
উমামার ভাষ্যমতে, ছাত্রশিবির নিজেদের “সাধারণ শিক্ষার্থী” বলে দাবি করলেও, মূলত এরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই ক্যাম্পাসে সক্রিয়।
তিনি লিখেছেন: “যারা এতদিন ছাত্রলীগের মধ্যে মিশে সার্ভাইভ করার ভং ধরে, সেই ছাত্র সংগঠন কিনা এখন আরেকজনকে ট্যাগ দিতে আসে।”
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে উমামা যে বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছেন, তা হলো—ছাত্ররাজনীতির ভেতরে ‘নতুন মুখোশে পুরনো এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। শিবির পরিচয় গোপন করে বা "নিরপেক্ষ সাধারণ ছাত্র" সেজে ক্যাম্পাসে জায়গা করে নেওয়ার কৌশল দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে।
উমামা তার পোস্টে ৮ মার্চের ধর্ষণবিরোধী মিছিলের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দাবি তোলা হয়েছিল আসিয়া ধর্ষণ ঘটনার বিচারের।
তাঁর অভিযোগ ছিল, যারা সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয় দেয়, তারা সেদিন মিছিলে যোগ দেয়নি। অথচ ক্যাম্পাসে ছোটখাটো ঘটনায় তারাই তড়িঘড়ি করে মিছিল করে। এটা নৈতিক দ্বিচারিতা বলে মনে করেন উমামা।
এই ঘটনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—ছাত্ররাজনীতি আজ আদর্শিক না কৌশলগত?
যারা নিজেদের নিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করে, তারা কি আদর্শিক আন্দোলনের সময় সামনে আসে, না কি শুধু রাজনৈতিক পুঁজি খাটানোর উদ্দেশ্যে সক্রিয় হয়?
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও ছাত্ররাজনীতির একটি বড় অংশ ছিল নিরব। উমামা উল্লেখ করেন:
“২০২৪ নির্বাচনের পুরোটা সময় মুখ ফুটে একটা শব্দও বের করেনি” – সেই সময় ছাত্ররাজনীতি যেন ট্রান্সজেন্ডার কোটা বাতিলের মতো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বেশি মনোযোগী ছিল।
এখানেই প্রশ্ন আসে—নির্বাচনী অনিয়ম, ভোটাধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি—এসব ইস্যুতে ছাত্রশিবির বা তথাকথিত সাধারণ ছাত্রদের অবস্থান কোথায়?
উমামার পোস্টটি একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—ছাত্রলীগবিরোধিতা মানেই কি ছাত্ররাজনীতির গঠনমূলক বিকল্প?
তিনি সতর্ক করেছেন, যারা আগে ছাত্রলীগের নির্যাতনের অংশ ছিল, এখন তারাই আবার ভিন্ন পরিচয়ে নিজেদের নিরীহ হিসেবে তুলে ধরছে, এবং রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দিয়ে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।
উমামা ফাতেমার পোস্ট শুধুই একক প্রতিক্রিয়া নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ইঙ্গিতবাহী বার্তা।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি আজ একটি সন্ধিক্ষণে—যেখানে একদিকে একচ্ছত্র আধিপত্যের রাজনীতি, অন্যদিকে বিকল্পধারার নামে পুরনো মুখোশধারীদের ফেরার চেষ্টা।
এই সময়টাতে সত্যিকারের স্বতন্ত্র, গণতান্ত্রিক এবং নীতিভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিকাশের জন্য সচেতনতা এবং বিশ্লেষণ জরুরি।
