সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ বাতিলের দাবিতে সচিবালয় কর্মচারীদের আন্দোলন তীব্র হচ্ছে। ঈদের পর ‘কঠোর আন্দোলন’-এর হুমকি সরকারি প্রশাসনের জন্য বড় সংকেত।

সাধারণত সচিবালয়ের কর্মচারীরা খুব একটা বিক্ষোভে নামেন না। কিন্তু সম্প্রতি সরকার কর্তৃক জারি করা সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ তাঁদেরকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রশাসনের মধ্যম সারির এই শক্তি যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে, তখন তা শুধু নীতিনির্ধারকদের জন্যই নয়, গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক সতর্ক সংকেত হয়ে ওঠে।
২২ মে ২০২৫ তারিখে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে পাস হওয়া ও ২৫ মে জারি হওয়া এই অধ্যাদেশটি মূলত ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইন সংশোধন করে প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এতে এমন কিছু ধারা যুক্ত হয়েছে, যা কর্মচারীদের কাছে দমনমূলক বলে মনে হয়েছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, এই আইন তাঁদের স্বাধীন মত প্রকাশ, সংগঠন গঠন এবং আন্দোলনের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই অধ্যাদেশে 'অবাধ্যতা', 'অশোভন আচরণ', বা 'সরকারবিরোধী বক্তব্য'র উপর কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কর্মচারীরা আশঙ্কা করছেন, এর অপপ্রয়োগের সুযোগ অবারিত এবং প্রশাসন তাঁদের মুখ বন্ধ রাখতে এই আইনের আশ্রয় নিতে পারে।
গত কয়েকদিন ধরে সচিবালয়ের কর্মচারীরা প্রতিদিন বিক্ষোভ করছেন, এবং বিভিন্ন উপদেষ্টার দপ্তরে স্মারকলিপি দিচ্ছেন। গত সোমবার (২৭ মে) তাঁরা উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলমের দপ্তরে স্মারকলিপি দেন। যদিও তাঁরা উপস্থিত ছিলেন না, তবে আন্দোলনকারী কর্মচারীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল আজহার পর তাঁরা ‘কঠোর আন্দোলনে’ যাবেন।
ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান বাদীউল কবীর সমাবেশে বলেন, ‘এই কালো আইন প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা মাঠে থাকব। শান্তিপূর্ণ আচরণকে দুর্বলতা ভাবলে তা বুমেরাং হয়ে যাবে।’ এমন হুঁশিয়ারি রাষ্ট্রযন্ত্রের শান্তিপূর্ণ রুটিন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
এই আন্দোলন শুধু সচিবালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বক্তারা জানিয়ে দিয়েছেন, সারা দেশের সরকারি অফিসগুলোতেও কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। একদিনের কর্মবিরতি থেকে আগামীতে পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট—এই ধারা চলতে থাকলে সরকারের অন্তর্বর্তী কাঠামো চাপে পড়তে বাধ্য।
এর মধ্যেই উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান স্বীকার করেছেন, কিছু বিধানের অপব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে। তিনি বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাপান সফর শেষে দেশে ফিরলেও এই বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি। সচিবালয় কর্মচারীরা তাঁর কাছ থেকে ‘আশাব্যঞ্জক খবর’ আশা করছেন। তবে তাঁর নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে। যদি আইনটি আংশিক বা পুরোপুরি প্রত্যাহার না হয়, তাহলে ঈদের পর যে ‘কঠোর আন্দোলন’ হতে পারে, তা শুধু প্রশাসনিক পক্ষেই নয়, সরকারের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
সাংবিধানিক অধিকার ও শৃঙ্খলা—দুটোর ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সংশোধিত আইনটি রেখে যদি ‘সেফগার্ড’ সংযোজন করা যায়, তাহলে হয়তো উভয় পক্ষের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। অন্যথায়, ঈদের পর পুরো প্রশাসন অচল হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ নিয়ে চলমান টানাপোড়েন সামান্য প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতির ওপরও প্রশ্ন তুলে দেয়। কর্মচারীদের স্বার্থরক্ষা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। ঈদের পর যদি আন্দোলন বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে তা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—উভয় ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার ‘কালো আইন’ প্রত্যাহার করে কি না, নাকি এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়।
