ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ্ব টিমে মালি, গানম্যান, চালকসহ অনভিজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও স্বচ্ছতা লঙ্ঘনের উদাহরণ।

সৌদি আরবে হজ মৌসুমে হাজিদের সহায়তা ও সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয় পাঁচটি বিশেষ টিম পাঠিয়েছে—শুরুতে এমনটাই জানা গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই ‘সেবা টিমে’ জায়গা পেয়েছেন মালি, গানম্যান, গাড়িচালক, অফিস সহায়ক থেকে শুরু করে সচিবদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং এমনকি ধর্ম উপদেষ্টার স্ত্রী ও বোনরাও। প্রশ্ন উঠছে—এটা কি হাজিদের কল্যাণে, নাকি প্রভাবশালীদের সৌদি সফরের মোড়কে সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত হজ ব্যবস্থাপনা?
ধর্ম মন্ত্রণালয় দাবি করছে, এই ২৯৩ জনের টিম সৌদি আরবে হাজিদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে। কিন্তু যেসব কার্যক্রমের জন্য এই টিম পাঠানো হয়েছে—পথ হারানো হাজিকে খুঁজে দেওয়া, চিকিৎসাসেবা, লাগেজ সমস্যা ইত্যাদি—তা হজ প্যাকেজেই অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং সৌদি সরকার সরাসরি পরিচালনা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এইসব টিমের উপস্থিতি হাজিদের সেবার মানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনে না। বরং সরকারি হজযাত্রীরা বছরের পর বছর অভিযোগ করে আসছেন—তাদের খাবার, বাসস্থান বা চিকিৎসা নিয়ে অসংখ্য সমস্যার কথা।
সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের হজে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ‘কারিগরি’ ও ‘সহায়তাকারী’ টিমে যুক্ত করা হয়েছে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির মোট ৬৪ জন কর্মচারী। যাদের অনেকেই কখনো হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
যেমন:
- মালি: সুমা আক্তার
- গাড়িচালক: আক্তারুজ্জামান সরকার, জাহাঙ্গীর আলম
- গানম্যান: সাইফুল হক
- অফিস সহায়ক ও সহকারী: মনিরুল ইসলাম, সুরাইয়া খাতুন
- সাঁটমুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর: ফারজানা সুলতানা, শাহাদাত হোসেন
এই তালিকায় থাকা বেশিরভাগের হজ সংক্রান্ত কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ফলে এই নিয়োগকে “সুবিধাভোগীদের পুরস্কৃত করা” বলেই মনে করছেন অনেকে।
ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন তাঁর স্ত্রী কামরুন্নেসা হাসিনা এবং দুই বোনকে হজ সফরে সঙ্গে নিয়েছেন, যদিও ২৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে জারি করা সরকারের নিজস্ব নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে—
“সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণের সময় কোনো কর্মকর্তার স্ত্রী, স্বামী কিংবা সন্তান সফরসঙ্গী হতে পারবেন না।”
এই অনুচ্চারিত ‘পারিবারিক সফর’কে সরকারি নীতিমালার লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই সিদ্ধান্তকে “প্রভাব খাটানো ও রাজনৈতিক বিবেচনার ফল” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এমনকি যদি সহায়তাকারী বা কারিগরি টিমে কিছুজন কর্মচারী প্রয়োজন হয়ও, তবে প্রশিক্ষিত ও প্রয়োজনীয় জনবল অন্য মন্ত্রণালয় থেকেও নেওয়া যেত।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, হজ টিমে অন্তর্ভুক্তির জন্য দেন-দরবার, তদ্বির, এবং অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ নিয়মিত ঘটনা।
না। এটি কেবল ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নয়, পুরো সরকারি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিফলন। একটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ীয় সমন্বয় ছাড়া হজ ব্যবস্থাপনার মতো বিশাল একটি কর্মসূচি পরিচালনা অসম্ভব।
অথচ প্রতিবারই দেখা যায়, কোনো জবাবদিহিহীন চক্র এই সেবাকে নিজেদের বেনিফিট ট্যুর বানিয়ে ফেলে।
হাজিদের সেবা নিশ্চিত করতে চাইলে—
- হজ টিমে নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
- বিদেশ সফরে পরিবারের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।
- কারিগরি বা সহায়ক টিমে কেবল পূর্ব অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত জনবল রাখতে হবে।
- পুরো হজ ব্যবস্থাপনা হতে হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক এবং উন্মুক্ত।
এই যে মালি-চালক-সহায়কদের দিয়ে হাজিদের সেবা করার প্রচেষ্টা দেখানো হচ্ছে, তা আসলে এক ধরনের ভ্রমণবিলাস ও বাজেট অপচয়ের গল্প।
সরাসরি জনগণের করের টাকায় অনভিজ্ঞ এবং অপ্রয়োজনীয় জনবল পাঠিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি প্রকৃত সেবাদানের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
এই চর্চা এখনই বন্ধ না হলে পরবর্তী বছরগুলোতে হজ সফর আরও দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে সাধারণ হাজিদের জন্য।
