গত ষোল বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেশের বাহিরে টাকা পাচারের অভিযোগ করে আসছে একটা পক্ষ। আগস্টের পাঁচ তারিখে আওয়ামীলীগ সরকারে পতনের পর থেকে এই অভিযোগ নিয়ে একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়।
এক এগারোর (১/১১) কুশীলব এবং জুলাই সন্ত্রাসে পিছনের কলকাঠি নাড়া পক্ষের অর্থনীতিবিদ সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ২০০৯-২০২৩ পর্যন্ত সময়ে বাৎসরিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে মত দেন। যার প্রমাণ হিসেবে তিনি “পরামর্শমূলক প্রক্রিয়ার” (consultative process) কথা বলেন। ইউনুস বিদেশি গণমাধ্যমে এই সংখ্যা প্রতিবছর ১৭ বিলিয়ন ডলার হবে বলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী ইফতেখারুজ্জামান একই সময়ে এই দুর্নীতি “পুরোপুরি প্রমাণযোগ্য নয়” বলেন।
এরপর দুর্নীতির এই পরিমাণ নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একধরনের ধাঁধা তৈরি করা হয়েছে।
পুরোপুরি কোনো প্রমাণ না দেখিয়ে শুধুমাত্র “মতামতের” উপর ভিত্তি করে একটা দল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবার, এবং তাদের সাথে জড়িত পাঁচ কোটির উপরে বাংলাদেশে বসবাসরত মানুষকে রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে হেয় করা শুরু হলো। অনেককে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে।
এর মধ্যেই হঠাৎ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যুক্তরাজ্য সফর থেকে ফিরে বললেন বাৎসরিক ১৬ বিলিয়ন ডলার নয় বরং ১৬ বছরে ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে থাকতে পারে। এর সাথে জড়িয়ে তিনি শেখ হাসিনা বা তার দলের নাম না নিলেও, চট্টগ্রাম ভিত্তিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এস আলমের নাম নিয়েছেন।
কেন টাকা পাচারের এই পরিমাণ বাৎসরিক ১৬ বিলিয়ন থেকে কমে (১৮ বিলিয়ন ভাগ ১৬ বছর) বাৎসরিক ১.১৩ বিলিয়ন ডলার হয়ে গেল? কেনইবা কমে গেছে জানার পরেও টাকা পাচার নিয়ে মিথ্যা বলে যাচ্ছে ইউনুস সরকার?
এই পর্যায়ে আমার প্রস্তাবনা হচ্ছে, তিনটা কারণে এই সংখ্যা হঠাৎ করে কমে গেছে।
প্রথমত, ইউনূসের ব্যক্তিগত, গ্রামীণ ট্রাস্টের নামে গ্রামীন ফোন এবং অন্যান্য সংস্থার টাকা পাচার, এবং সমন্বয়কদের হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে সরাতে এই ঘৃণ্য উদ্যোগ। দ্বিতীয়ত, টিউলিপ সিদ্দিক এবং আওয়ামীলীগের টাকা পাচারের হিসাব একসাথে বলে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে জনগণের চোখ সরিয়ে নেয়া।
বিদেশে টাকা পাচারের তিনটা বড় পদ্ধতি আছে – বাণিজ্যের মাধ্যমে, মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে, এবং মাদক এবং অন্যান্য উপায়ে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে।
শেখ হাসিনার আমলে এগুলোর সাথে জড়ানো হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি কমে যাওয়াকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর খালিদ মাহমুদের অনলাইন টিভি শোতে নিজে বলেছেন বৈদেশিক মুদ্রার কমে যাওয়ার মধ্যমে এই প্রমাণ হয় যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে কম অথবা অতিরিক্ত চালান মূল্য (over and under invoicing) দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে ডলার বাইরে পাচার করা হয়েছে।
আরেকটা চ্যানেল থেকে বলা হয়েছে ব্যাঙ্কিং খাতে যে খেলাপি ঋণ হয়েছে, তাতেও টাকা বাইরে চলে গেছে। এক্ষেত্রে এস আলমের নাম বেশি উচ্চারিত হয়েছে।
আসলে কি বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি কমে গেলে সেটাকে ডলার পাচার বলা যাবে? ঋণ খেলাপি আসলেই কত ছিলো? প্রতিবছর ১.১৩ বিলিয়ন ডলার ইউনূসের দশ মাসের ২০ বিলিয়ন ডলার পাচারের পরিসরে কত বড়?
আসুন ডাটা দিয়ে দেখি।
আমরা কয়েকটা ডাটা সিরিজ দেখার চেষ্টা করবো। সব ডাটা বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্লুম্বারগ, ট্রেডিং ইকোনমিক্স এবং অন্য নির্দিষ্ট ডাটা প্রদানকারী সংস্থার ওয়েবসাইট থেকে চেক করে নেয়া হয়েছে।

১) বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি কমে যাওয়ার মানে টাকা পাচার নয়।
চিত্র ১ থেকে দেখুন (সবুজ রঙের শেডেড এরিয়া), বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার সর্বোচ্চ সঞ্চিতি (গ্রস মেথডে) ছিলো আগস্ট ২০২১ সালে ৪৮.১ বিলিয়ন ডলার। কোভিডের কারণে সেসময় পুরো পৃথিবীর আমদানি রপ্তানি কার্যকলাপ মোটামুটি বন্ধ। পুরো পৃথিবীজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা। তার পরের মাস থেকেই মুদ্রার সঞ্চিতি কমতে থাকে।
ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে যখন রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরু হয় তখন মুদ্রার সঞ্চিতি ছিলো ৪৫.৯ বিলিয়ন ডলার। এই দুইটা ক্রাইসিস যখন একসাথে আঘাত করে তখন আমাদের আমদানি নির্ভর দেশে মুদ্রার সঞ্চিতি ধরে রাখা খুবই মুশকিল।
একদিকে রপ্তানি কমে যাচ্ছিলো। অন্যদিকে বিশ্বব্যপী আমদানির খরচ বাড়ছিল।
ফলশ্রুতিতে মে ২০২৪ এ আমাদের সঞ্চিতি দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কমে দাঁড়ায় ২৪.২ বিলিয়ন ডলার। তারপরের মাসে জুনে সেটা আবার বেড়ে হয় ২৬.৭ বিলিয়ন ডলার, যা ইউনুস সরকারের মে ২০২৫ এর ২৫.৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি ছিলো।
চিত্র ১ এ গোলাপি লাইন থেকে দেখা যাচ্ছে এপ্রিল ২০২০ থেকে জুলাই ২০২০ (২.৬ বিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেশি ছিলো, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতির উপর। চিত্র ১ এ আরও দেখানো হয়েছে আমদানি (লাল রঙের লাইন) এবং রপ্তানির (কালো রঙের শেডেড এরিয়া) কি প্রভাব পড়েছে মুদ্রার সঞ্চিতির উপর। আমদানি ব্যায় এবং রপ্তানি আয়ের মধ্যে পার্থক্যই ঠিক করে দিচ্ছে মোট সঞ্চিতি।
কোভিড এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে আমাদের যতই আমদানি খরচ বাড়ছিল, ততই মুদ্রার সঞ্চিতি কমতে থাকে। সেজন্য আওয়ামীলীগ সরকার জুন ২০২২ থেকে আমদানি সঙ্কুচিত করতে থাকে। এতেই ক্ষেপে যায় পশ্চিমা বিশ্ব। সৃষ্টি করা হয় কৃত্তিম ডলার ক্রাইসিস।
এই আমদানি সঙ্কুচিত করেও রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল সরকার। কিন্তু বিদেশি পয়সায় জঙ্গি হামলায় ক্ষমতা হারাতে হয় আওয়ামীলীগকে।

এবার চিত্র ২ দেখুন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান মনসুর বলেছেন বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি কমে যাওয়া মানে শেখ হাসিনা টাকা পাচার করেছে। এটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য আমি চার দেশের সঞ্চিতি দেখছি – সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, এবং পাকিস্তান।
জানুয়ারি ২০২২ এর ভিয়েতনামের সর্বোচ্চ সঞ্চিতি পৌঁছায় ১১০ বিলিয়ন ডলারে। ফেব্রুয়ারি ২০২২ এ সিঙ্গাপুরের সর্বোচ্চ সঞ্চিতি ৫৭৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার, বাংলাদেশ আগস্ট ২০২১ এ ৪৮.১ বিলিয়ন, এবং পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সঞ্চিতি একই মাসে ২৭.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এক বছর পর ভিয়েতনামের সঞ্চিতি দাঁড়ায় ৮৬.৪ বিলিয়ন ডলার, সিংগাপুরের ৩৯৬ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার, বাংলাদেশ ৩৯.১ বিলিয়ন ডলার, এবং পাকিস্তান ১৪.২ বিলিয়ন ডলার।
মাত্র এক বছরে কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে ভিয়েতনামের সঞ্চিতি কমেছে ২৩.২ বিলিয়ন ডলার, সিঙ্গাপুরের ১৮৩ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার (তখনকার হিসেবে ১৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), বাংলাদেশের ৯ বিলিয়ন ডলার, এবং পাকিস্তানের ১২.৯ বিলিয়ন ডলার।
এই কমে যাওয়ার কারণে আমি কি বলতে পারব যে সিংগাপুরের সরকার দেশ থেকে এক বছরে ১৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার করেছে? অথবা ভিয়েতনামিজ সরকার ২৩.২ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে?
কেউ এমন বলে না। যারা বলে তাদের হয়তো উদ্দেশ্য খারাপ, নয়তো তারা অশিক্ষিত। তারা নিজেদের দুবাইয়ের ৪৫ কোটি টাকার প্যালেস কিংবা ১০ মাসে দেশ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার খবর চাপা দিতে চাচ্ছে।
এই পর্যায়ে আছে আমার দ্বিতীয় প্রস্তাবনা। শেখ হাসিনার শক্তিশালী খাত ছিলো আমদানি-রপ্তানি-(মুদ্রার) সঞ্চিতির ভারসাম্য। নিজেদের টাকা পাচার এবং চাঁদাবাজির খবর চাপা দিতেই ইউনুস সরকার সক্রিয়ভাবে মুদ্রার সঞ্চিতির সাথে মিলিয়ে দুর্নীতির কথা প্রচার করেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি নিয়ে সবচেয়ে মজার ব্যপার খেয়াল করেছেন?
আমরা জানি, প্রধানত রপ্তানি আয় বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সুদূরপ্রসারী বৃদ্ধি হয়। জানুয়ারি ২০২২ এ ভিয়েতনামের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি ছিলো ১১০ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ এ ভিয়েতনামের মোট রপ্তানি আয় ছিলো ৩৩৬.৩১ বিলিয়ন ডলার। তাহলে মুদ্রার সঞ্চিতি এবং রপ্তানির অনুপাত হচ্ছে ০.৩৩ – এক ডলার রপ্তানিতে তখনকার সময়ে ০.৩৩ ডলার সঞ্চিতিতে যাচ্ছিলো (অন্যান্য জিনিস স্থির রেখে)। শেখ হাসিনার সময়ে আগস্ট ২০২১ এর ৪৮.১ বিলিয়ন সঞ্চিতির বিপরীতে রপ্তানি ছিলো ৩৮.৮৬ বিলিয়ন ডলার, যার অনুপাত ১.২৪।
তার মানে শেখ হাসিনার সবচেয়ে শক্তিশালী খাতকে শুধু মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে তার সবচেয়ে দুর্বল খাত বানিয়ে দেয়া হলো।
২) মেগা প্রজেক্টের দুর্নীতির কোনো প্রমাণ নাই।
মেগা প্রজেক্টের দুর্নীতির গল্প কতটুকু বানোয়াট এটা দুইটা উদাহরণ থেকে দেখা যেতে পারে।
প্রথমত, ভারতের সাথে, বিশেষ করে আদানি গ্রুপের সাথে, আওয়ামীলীগের বিদ্যুৎ বিতরণের চুক্তি নিয়ে যে দুর্নীতির এবং দেশ বিক্রির গল্প তৈরি করা হয়েছিলো তা ইতিমধ্যে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ভারত এবং অন্যান্য দেশের সাথে করা কোনো মেগা প্রকল্পই ইউনুস সরকার বাতিল করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে টিউলিপ সিদ্দিককে জড়িয়ে যে বিলিয়ন ডলার দুর্নীতির গল্প উঠেছিলো, তার জবাব চাইতেই বরং বছরে ১৬ বিলিয়নের টাকা পাচার কমে ১৬ বছরে ১৮ বিলিয়ন হয়ে গেছে। এমনই অবস্থা যে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল খিলাড়ির সাথে ব্রিটিশ সরকার দেখা পর্যন্ত দিতে রাজি হচ্ছেনা।
যদি ১৬ বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়, তাহলে বছরে প্রায় ১.১৩ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। একটা মজার তুলনা দেখাই।
বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ আমদানি-রপ্তানির আয়-ব্যয়ের হিসাব মীমাংসা করার জন্য বিভিন্ন দেশের সাথে করেসপন্ডেন্স ব্যাঙ্কিং করে থাকে। এতে এই সব বিদেশি ব্যাংকে যে ডলার জমানো রাখতে হয় তা কিছুদিন পরপর টপ-আপ (অতিরিক্ত জমা) করতে হয়। প্রয়োজনে লোন নিতে হয়। এতে ডলারের দাম উঠানামা করার কারণে ক্লিয়ারিং ইউনিটের পেমেন্টের পর বেশিরভাগ দেশকে অতিরিক্ত ডলার জমা করতে হয়।
এই লসের কারণে বছরে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে হারাতে হয় গড়ে ১.৯৮ বিলিয়ন ডলার। চিন্তা করে দেখুন, আওয়ামীলীগের এতো এতো দুর্নীতি (বছরে ১.১৩ বিলিয়ন ডলার) প্রতিবছর ঘটে যাওয়া সামান্য ডলার উঠানামা জনিত ক্ষতির চাইতেও কম।
৩) খেলাপি ঋণের মাধ্যমে টাকা পাচার।
বলা হচ্ছে শেখ হাসিনার সাথে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধ না করে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। এই মধ্যে সবচেয়ে বেশি শুনা যাচ্ছে এস আলম গ্রুপের নাম।

এর বিশ্লেষণে আসার আগে চিত্র ৩ এ দেখুন বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের কিছুদিন আগের পরিসংখ্যান।
চিত্র ৩ এর অনুপাতগুলো থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত মোট মন্দ ঋণকে যদি ১০০ টাকা ধরি, তাহলে ৬০ টাকা মন্দ ঋণ হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত। আর বাকি ৪০ টাকা মন্দ ঋণ হয়েছে জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ এর ছয় মাসে।
বলতে পারেন যে আগের মন্দ ঋণের অংশ আরও বেড়েছে। তাহলে জুলাই চেতনায় উদ্বুদ্ধ সন্ত্রাসীদের ইউনূসের নেতৃত্বে আগুন জ্বালিয়ে হাজারো ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের কয়লা বানানো, তাদের জীবিকা ধ্বংস করা সহ ২০ লাখ মানুষের কর্মহানি কি এই মন্দ ঋণে কোনো অবদান নেই?
ধরে নিলাম নেই। তারপরও ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৪) ৪০% মন্দ ঋণের বিপরীতে স্বাধীনতার পরের ৫৪ বছরের মন্দ ঋণের দায়ও শেখ হাসিনাকে নিতে হবে?
তাহলে এটা বললে কি ভুল হবে যে এই নতুন ছয় মাসের ৪০% মন্দ ঋণের টাকা ইউনূসের লোকজন দেশের বাহিরে পাচার করে দিয়েছে?
টাকা পাচারের গড ফাদার তারেক রহমান এবং তার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন ২০০৪-০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে আট দেশে পাচার করেছিল বিশ হাজার কোটি টাকা। এই সব অপরাধ থেকে তারা এখন মুক্ত। তাহলে শুধু শেখ হাসিনা কেনো?
৪) এস আলমকে জড়ানো হয়েছে কেনো?
আর্থিক খাতের দুর্নীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাবলিসিটি পেয়েছে এস আলমের ১০০০০ (দশ হাজার) কোটি টাকা “বিদেশে ইনভেস্ট” করার সূত্র ধরে।
এস আলমের খেলাপি ঋণ নিয়ে ১০০০০ কোটি টাকার যে হিসেব, তাতে কেউ একবার চিন্তা করে দেখলোনা এস আলমের কত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি আছে দেশে। তাদের সব প্রতিষ্ঠান চলমান ছিলো এবং লাভ করছিল।
এস আলম এবং অভিযোগ উঠা আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের চাঁদার টাকায় এখন নতুন দল এনসিপি নেতারা দামি গাড়িতে চড়েন, দশ হাজার টাকা প্রতি প্লেট ইফতার কিনে খান।
তাহলে শুধু এস আলম নিয়ে রাগ কোথায়?
রাগ হচ্ছে, এস আলম ইসলামী ব্যাংকের মালিকানায় আসাতে জামায়াতে ইসলামীর ইসলামী ব্যাংকের উপর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড বাংলাদেশে ফর্মাল সেক্টরে জামায়াতে ইসলামীর “প্রথম সন্তান”। এর আগে জেনারেল জিয়ার হত্যার পর এরশাদকে ক্ষমতায় বসিয়ে মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলোর সাথে আদম ব্যবসায় এবং হজ্ব কাফেলা ব্যবসায় দিয়ে জামাত বাংলাদেশে টাকা বানানো শুরু করে। ১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের আমলেই শুরু হয় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।
যেহেতু জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রতিষ্ঠানগুলিকে শুধুমাত্র নিজেদের লোকদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহার করে, এস আলমের বিরুদ্ধে এই প্রোপাগান্ডা খুবই স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক। যদি তা না হবে তাহলে ৩০০০ কোটি ঋণ খেলাপি হয়ে পি কে হালদার ইউনুস সরকারের আমলে জেল থেকে ছাড়া পায় কিভাবে?
ইসলামী রাজনীতির সাথে জড়িত বিভিন্ন গোষ্টীর মালয়েশিয়া, তুর্কি, কাতার হয়ে যুক্তরাজ্যে প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগের নামে টাকা পাচার নিয়ে খোদ যুক্তরাজ্যের সরকার শঙ্কিত।
কিছু সপ্তাহ আগে মুসলিম এইড ইউকের সাথে বাংলাদেশের চিহ্নিত যুদ্ধপরাধী, জর্জ সরোসের ওপেন সোসাইটি এবং পাকিস্তানি আইএসআই এর নিবিড় সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ধারণা করা হয় বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের যাকাত সদকার একটা বড় অংশ লুট করার জন্য মুসলিম এইড যুক্তরাজ্যের মতো একটা দাতব্য সংস্থাকে সামনে আনা হয়েছে। এগুলোকে ধামাচাপা দিতেই সামনে আনা হয়েছে এস আলম কাহিনী।
তাহলে মোটা দাগে দেখা যাচ্ছে টাকা পাচারের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তার সাথে শেখ হাসিনা কিংবা তার পরিবার কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়।
আওয়ামীলীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মেগা প্রজেক্ট এবং খেলাপি ঋণের নামে দুর্নীতির আশংকাকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল করা হচ্ছে।
এর মধ্যে ইউনুসের আশীর্বাদপুষ্ট এনসিপি নেতাদের হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি, জামাতের হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি, ব্যাংক এবং শেয়ার বাজার ধ্বংস করে দেয়া, এবং মাত্র দশ মাসে দেশ থেকে বিশ বিলিয়ন ডলার পাচার করার তথ্য যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
সাড়ে বাইশ হাজার কোটি টাকা নতুন প্রিন্ট করে ছয়টা ব্যাংককে (চারটা ইসলামিক ব্যাংক) দাঁড় করানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে যখন ব্যাঙ্কিং সেক্টরেই ছিলো এক লাখ চল্লিশ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য।
এই ছয়টা ব্যাংককে টাকা প্রিন্ট করে দেয়া হয়েছে যেনো তাদের ডিপোজিটের উপর সুদে কোনো খরচ না হয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে এই ধরনের সুবিধা দেয়া সরাসরি দুর্নীতি।
এই দুর্নীতির বিচার করবে কে? আর সরাসরি টাকা মুদ্রণ করে ইসলামিক ব্যাংক বাঁচানো হলে তা আর কতটুকু ইসলামিক থাকলো?
তাহলে কি আওয়ামীলীগ আমলে দুর্নীতি হয়নি?
উন্নতি যেহেতু হয়েছে দুর্নীতিও হয়েছে। দুর্নীতি হচ্ছে উন্নয়নের উপজাত এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিণতি।
আওয়ামীলীগকে যারা টাকা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করছে, তারা হয়তো টাকায় দুর্নীতি না করে অস্ত্র বিক্রি করে আরেক দেশ দখলে নিচ্ছে, কোটির উপরে মানুষ মারছে। সেই সংজ্ঞায় আওয়ামীলীগেরটা দুর্নীতি হলে তাদেরটা কি হবে?
পশ্চিমা বিশ্ব যাদেরকে ধরে ধরে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিচ্ছে, তাদের দুর্নীতি ঢাকতে মানুষ মেরে, পুলিশ মেরে, দেশের সরকার ফেলে দিতে হচ্ছে।
শেখ হাসিনা ৩৮.৮৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি দিয়ে ৪৮.১ বিলিয়নের সঞ্চিতি করে দেখিয়েছেন। কয়জন তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছি? উনিশ বার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসা একজন মহিলা আর কত ভালো দেশ চালালে আপনারা খুশি হবেন? এখনতো ঘর থেকেই বের হতে ভয় পান।
