গোপালগঞ্জে সেনা ও পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত, শতাধিক আহত। ফরাসি মানবাধিকার সংস্থা জেএমবিএফ বলছে—এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিশ্লেষণে তুলে ধরা হলো এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া।
গোপালগঞ্জে গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি রক্ষায় নিরস্ত্র বেসামরিক জনতার ওপর সেনাবাহিনী ও পুলিশের গুলিবর্ষণে চারজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)।
জেএমবিএফ এক বিবৃতিতে জানায়,
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত দল এনসিপি গোপালগঞ্জে ‘মুজিববাদকে কবর দেওয়া হবে’ বলে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ বঙ্গবন্ধুর সমাধি রক্ষায় শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সরাসরি গুলিবর্ষণ করে।
ফলে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন এবং গুরুতর আহত হন আরও বহু মানুষ।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দীপ্ত সাহা (২৫), রমজান কাজী (২৪), সোহেল মোল্লা (৩৫) এবং ইমন তালুকদার (২৮)।
সংগঠনটির মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বিক্ষোভকারীরা নিরস্ত্র এবং শান্তিপূর্ণ ছিল, তাদের হাতে লাঠিসোঁটা বা ঢিল ছাড়া কোনও অস্ত্র ছিল না।
অথচ ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা সরাসরি গুলি চালাচ্ছে, গ্রেপ্তারকৃতদের নির্মমভাবে নির্যাতন করছে, এমনকি গুলি করে ফেলে দেওয়া ব্যক্তির মুখমণ্ডলে ও গলায় বুট চেপে হত্যা নিশ্চিত করছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়,
গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মানুষ—গান্ধিয়াশুর, উলপুর, চৌরাস্তা, বাসস্ট্যান্ড থেকে মিছিল নিয়ে এনসিপির ওই উস্কানির প্রতিবাদে পথে নামেন।
শহরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সেনাবাহিনী মাঠে নামে এবং সহিংসভাবে পরিস্থিতি দমন করতে শুরু করে।
এতে নারী ও শিশুসহ অসংখ্য নিরীহ নাগরিক হামলার শিকার হন।
আহতদের অনেককে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
জেএমবিএফ-এর প্রধান উপদেষ্টা, খ্যাতনামা ফরাসি মানবাধিকারকর্মী বলেন,
গোপালগঞ্জের এই হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিসমূহ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক অধিকারগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন।
তিনি বলেন,
রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং বরং নিজেই সহিংসতার আশ্রয় নেয়, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম বলেন,
এই ধরনের গুলি চালনা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আওতাভুক্ত হওয়া উচিত।
তিনি অভিযোগ করেন, আহতদের গলায় পা চেপে হত্যা এবং আহতদের তাচ্ছিল্য করে গাড়িতে ফেলে দেওয়া যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য অপরাধ। বাংলাদেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আজ চরম হুমকির মুখে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, সেনা সদস্যরা নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালাচ্ছে এবং আহতদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তিকে সুস্থ অবস্থায় ধরে নেওয়ার পর তাকে গুলি করে ফেলা হয় এবং রাস্তায় ফেলে মুখে ও গলায় বুট চেপে রাখা হয়।
একাধিক ভিডিওতে আহতদের চিৎকার ও রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করতে দেখা যায়।
হাসপাতালে নেওয়া মৃতদেহগুলোর শরীরে গুলির স্পষ্ট চিহ্নও উঠে আসে ভিডিওচিত্রে।
এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে জেএমবিএফ পাঁচটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছে।
প্রথমত, তারা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে,
যাতে দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের বিচার নিশ্চিত করা যায়।
দ্বিতীয়ত, তারা মনে করে, এই হত্যাকাণ্ডের দায় নিয়ে ইউনূস সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।
তৃতীয়ত, তারা জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে,
তারা যেন এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরে এবং তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
চতুর্থত, এই ঘটনার সাথে জড়িত সেনাসদস্যদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত দাবি জানানো হয়েছে।
পঞ্চমত, নিহত ও আহতদের পরিবার যেন যথাযথ চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ পায় তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
জেএমবিএফ-এর বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই ঘটনা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আরেকটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা—তাদের গুলি করা নয়।
সংগঠনটি ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আন্তর্জাতিক মহলকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে এবং জানিয়েছে যে, তারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
