বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ২৫টি বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তে বিস্মিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। প্রয়োজন ও প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে আমলাতান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই চুক্তি কতটা যৌক্তিক?
যার জন্য উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, সেই রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাই জানে না! যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং কেনার ‘অর্ডার’ দিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ সরকার, অথচ জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানে না তাদের জন্যই নাকি এই চুক্তি হচ্ছে। এমন অস্বাভাবিক ঘটনা কেবল আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তচক্রে সম্ভব, যেখানে প্রয়োজন নয়, বরং রাজনীতিক কূটনৈতিক চাপই হয়ে ওঠে বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ঘোষণা করেছেন,
যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ‘অর্ডার’ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন—আমাদের বহর বাড়ানো দরকার, শুল্ক ছাড়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে হবে।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, যাদের হাতে এই বহর যাবে, সেই বিমান বাংলাদেশ জানে না কিছুই।
বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক রওশন কবীর সরাসরিই বলেছেন, “আমরা কিছুই জানি না।”
এই মন্তব্যেই স্পষ্ট, পুরো সিদ্ধান্তটি এসেছে ‘টপ-ডাউন’ স্টাইলে, বিমানের ফ্লিট প্ল্যানিং বা পরিচালনা পর্ষদকে না জানিয়েই।
সাধারণভাবে কোনো কমার্শিয়াল এয়ারলাইন্স ফ্লিট কিনবে কী কিনবে না—তা নির্ধারণ করে তাদের ফ্লিট প্ল্যানিং কমিটি।
এই কমিটি পর্যালোচনা করে রুট, যাত্রীসংখ্যা, খরচ, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI), এবং মেইনটেন্যান্স সাপোর্ট।
এরপর বোর্ডে উপস্থাপন করে।
বোর্ড তখন দরপত্র আহ্বান করে বোয়িং ও এয়ারবাসের মত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে।
সাবেক বোর্ড সদস্য কাজী ওয়াহেদুল আলম মনে করেন, এ ধরনের চুক্তি একচেটিয়া নয়, প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
তার মতে, “বিমানের পর্ষদকে না জানিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী।”
সচিব বলছেন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মত দেশগুলোও বোয়িং কিনছে।
কিন্তু তারা কি বিমানের মত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মাথায় না জানিয়েই?
প্রশ্ন উঠছে—
এটা কি সত্যিই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য, নাকি পর্দার আড়ালে রয়েছে কূটনৈতিক চাপ মেটানোর এক চুক্তিভিত্তিক কৌশল?
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২৫টি উড়োজাহাজের অর্ডার মানেই প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক দায়।
একদিকে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে বিমান এখনো নিজস্ব পরিচালন-ব্যয় ঠিকমতো টানতে হিমশিম খাচ্ছে।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১০টি বোয়িং কেনা হয়—কিন্তু তা হয়েছে যথাযথ বোর্ড অনুমোদন ও দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আজকের চুক্তিতে নেই সেই স্বচ্ছতা।
তখন বোয়িং ও এয়ারবাস দু’পক্ষের প্রস্তাব নিয়ে নেগোশিয়েশন করে বাড়তি সুযোগ নেওয়া হয়েছিল—যেমন, নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর জন্য FAA ক্যাটাগরি-১ উন্নীতকরণ, পাইলট প্রশিক্ষণ সুবিধা, মেইনটেন্যান্স চুক্তি ইত্যাদি।এবার সেসব নেই, নেই মূল্যবোধের স্বচ্ছতাও।
এটি কি রাজনীতির নামে জাতীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ?
রাষ্ট্র যদি সংস্থার কার্যক্রম ও সক্ষমতা না জেনে, নিজে থেকেই বহির্বিশ্বে বাণিজ্যিক চুক্তি করে ফেলে—তবে তার দায় কে নেবে?
এই সিদ্ধান্ত ‘বিমানের নয়, সরকারের’—এই বার্তা স্পষ্ট।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়:
❝ সরকার কি তাহলে বিমানকে ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণ বা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে? ❞
‘২৫টি বোয়িং’ শুধু একটি সংখ্যাই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্থনীতি, প্রশাসনিক অপারদর্শিতা ও স্বচ্ছতা সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে নেওয়া এমন সিদ্ধান্তের পরিণতি একদিকে আর্থিক, অন্যদিকে প্রশাসনিক দৃষ্টান্তে এক ভয়াবহ নজির তৈরি করতে পারে।
