চলচ্চিত্র তারকা শবনম ফারিয়ার রাজনৈতিক হতাশা ও সামাজিক বঞ্চনা নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে উঠেছে বিতর্ক ও সমর্থনের ঝড়। এই বিশ্লেষণধর্মী কলামে উঠে এসেছে নাগরিক নিরাপত্তা, ভিসা সংকট এবং ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামোর বাস্তবতা।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, দুর্নীতির স্বরূপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত কথা বলছেন—কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন পরিচিত মুখ হয়ে এসব ইস্যুতে আওয়াজ তোলেন, তখন সেটা আরও বেশি প্রতিধ্বনি তোলে। চলচ্চিত্র ও ছোটপর্দার সুপরিচিত অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া তার সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্টে যে হতাশা ও রাগ উগরে দিয়েছেন, তা যেন লাখো সাধারণ নাগরিকের মৌন আকুতির প্রতিচ্ছবি।
১লা আগস্ট নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন—
“এমন এক দেশে জন্ম, কার কাছে বিচার দেব, জানি না।
এক পার্টির বড়রা টাকা মেরে ভাগছে, ছোটরা অনলাইনে ‘জুলাই সিডিআই’ লিখে সেই শোক কমায়, আর বাকিরা চাঁদাবাজি, ডোনেশন, হাদিয়া নিয়ে কামড়া-কামড়ি করে পারাপারের রাস্তা ঠিকঠাক করে!”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরাসরি বর্তমান সময়ের দুই বিপরীত রাজনৈতিক ব্লক—সরকারি ও তথাকথিত বিরোধী পক্ষের নৈতিক অবস্থান এবং আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি নিজেকে এবং তার মতো সাধারণ নাগরিকদের বর্ণনা দিয়েছেন এক নীরব দর্শকের মতো, যারা “রঙিন তামাশা দেখে” সময় কাটান, কিন্তু কোনো পক্ষই তাদের হয়ে কথা বলে না।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশটি সম্ভবত তার পোস্টের শেষ বাক্য—
“এই সবুজ পাসপোর্টে কেউ ভিসাও দিচ্ছে না! কই যাব আমরা?”
এই বাক্যে প্রতিফলিত হয়েছে শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, পর্যটক, চিকিৎসাপ্রার্থী এবং ব্যবসায়ীর হতাশা।
ইউরোপ-আমেরিকাসহ অনেক উন্নত দেশের দূতাবাসে এখন ভিসার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
এমনকি পর্যাপ্ত ব্যাংক ব্যালান্স, পাস ভ্রমণ ইতিহাস, কিংবা ভালো চাকরি থাকার পরও বারবার ভিসা প্রত্যাখ্যান হচ্ছে।
এই সমস্যার পেছনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং অভিবাসন সংকটের ভূমিকাও অস্বীকার করা যাবে না।
শবনম ফারিয়া আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন সাহসী ও স্পষ্টভাষী এক শিল্পী হিসেবে।
জুলাই মাসের ছাত্র আন্দোলনের সময়ও তিনি সরাসরি শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছিলেন।
তার ভাষায়—
“কিছু বললেই এক পক্ষ বলে, ‘ডলার খেয়েছেন, লাল স্বাধীনতা কেমন লাগে?’
অন্য পক্ষ বলে, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর!’”
এই বাক্যগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমানে কোনো সৎ বা নিরপেক্ষ অবস্থান নিতেই ব্যক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রায় অনুপস্থিত, আর কেউ নিরপেক্ষ কিছু বললেও তাকে দুই পক্ষই আক্রমণ করে।
এই পোস্ট প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোরগোল পড়ে যায়।
অনেকে শবনম ফারিয়ার সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন, কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন তার উদ্দেশ্য ও সময় নির্বাচনের পেছনের কারণ নিয়ে।
এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট—বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো তারকা ব্যক্তিত্বের পক্ষ নেওয়া মানেই এক পক্ষের সমর্থন ও অন্য পক্ষের বিরোধিতা নিশ্চিত।
শবনম ফারিয়ার এই পোস্ট শুধু একটি অভিযোগ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
যেখানে নাগরিকদের জীবনে নিরাপত্তা, সম্মান ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
যে দেশ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই দেশেরই নাগরিকরা আজ প্রশ্ন করছেন—“কই যাব আমরা?”
প্রশ্নটা এখন শুধু ফারিয়ার নয়, বরং আমাদের সবার।
