সূত্র: @bbcbangla
বাংলাদেশে আবারও ভয়াবহভাবে বাড়ছে গণপিটুনির ঘটনা, যেন এক মরণঘাতী সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মানুষকে সন্দেহের বশে, গুজবে কিংবা জনরোষে নির্মমভাবে মারধর করা হচ্ছে; কখনো কখনো প্রাণও যাচ্ছে।
এসব ভয়াবহ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে; অনেক সময় শিশুদের সামনেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
সম্প্রতি নরসিংদীতে কেবল চুরির সন্দেহে দুই ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়; যা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আরেক ঘটনায়, তিন বছরের মেয়ের সামনে এক বাবাকে নৃশংসভাবে মারধর করা হয়, কারণ মানুষ ভুলভাবে ধরে নেয় শিশুটি অপহৃত হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী; ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত অন্তত ১১৯ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালের শুরু থেকেই ১৭৯ জন মারা গেছে। গত দশকে যা সর্বোচ্চ। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (MSF) জানায়, মার্চ ২০২৫ মাসেই ৩৯টি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৫৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের শাসনের ভাঙন, বিচারহীনতা এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর অনুপস্থিতিই এই সহিংসতার মূল কারণ। গত ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, সেটাই এখন ভয়ংকর অরাজকতায় রূপ নিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিদ ড. তৌহিদুল হক বলেন,
“গণপিটুনির ঘটনায় বিচারপ্রাপ্তির হার শূন্য। এই অপরাধগুলো অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে না। এটাই এর পুনরাবৃত্তির কারণ।”
MSF-এর নির্বাহী পরিচালক ও আইনজীবী সাইদুর রহমান বলেন,
“পুলিশ নিষ্ক্রিয়। মানুষ মনে করে গণবিচারে কোনো পরিণতি নেই—আর অনেক সময় তা-ই হয়। যখন বিচার থাকে না, তখন সহিংসতা বাড়ে।”
যদিও পুলিশ দাবি করে, ঘটনার পর তারা ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ বা দায়বদ্ধতার প্রমাণ নেই। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পূর্বে একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে এই বক্তব্য কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে গণপিটুনির শুরু সাধারণত গুজব থেকে: কেউ চোর, শিশু অপহরণকারী, কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। জনতা জড়ো হয়, প্রমাণ ছাড়াই শুরু হয় সহিংসতা। সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনির ঘটনায় এমনকি হাসিনা সরকারের সমর্থকদের ওপরও হামলার ঘটনা দেখা যাচ্ছে; যা এটিকে রাজনৈতিক রঙও দিচ্ছে।
একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, এক কিশোর পুকুরের পানিতে কোমর পর্যন্ত ডুবে জীবন ভিক্ষা চাইছে, পাড়ে দাঁড়ানো জনতা অপেক্ষা করছে। একজন লাফিয়ে তাকে ধরে টেনে তুলে নির্মমভাবে মারধর করে। তার ভাগ্য কী হয়েছে, তা এখনো অজানা।
কিশোরগঞ্জে সোহেল মিয়াকে তাঁর ছোট্ট মেয়ের সামনে পিটিয়ে অচেতন করে ফেলা হয়। মেয়েটির কান্নাকে ভুলভাবে অপহরণের ইঙ্গিত ধরে নিয়েছিল জনতা। কেউ কিছু শুনেনি, শুধু মেরেছে।
ড. হক বলেন,
“এখন এমন এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে জনতা নিজেরাই ‘সামাজিক বিচারক’ হয়ে উঠছে। অনেকে অনলাইনে এমন হত্যাকাণ্ডকে সমর্থনও করছে। কেউ কেউ আবার এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা চাঁদাবাজির জন্য। রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় তারা সাহস পাচ্ছে।”
মানবাধিকার কর্মীরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন; এখন আর কেউ নিরাপদ নয়। ডজনখানেক ভিডিওতে দেখা যায়, নিরীহ মানুষকে টেনে, লাথি মেরে বা লাঠিপেটা করে হত্যা করা হচ্ছে, আর চারপাশে লোকজন উল্লাস করছে।
সিলেটি বাজার, কামরাঙ্গীরচরে এক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এটি আরেকটি উদাহরণ যেখানে জনতা নিজেই বিচারক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের আদালতে এখন পর্যন্ত গণপিটুনির ঘটনায় দোষীদের শাস্তি দেওয়ার নজির প্রায় নেই। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই বিচারহীনতাই এই অপরাধের বিস্তারে সহায়তা করছে।
সাইদুর রহমান বলেন,
“রাষ্ট্র কার্যত তার নাগরিকদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব থেকে পিছু হটেছে। গণপিটুনি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা নয়—এটা আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পতন।”
ড. হক বলেন,
“গণপিটুনির এই প্রবণতা এক ধরনের মহামারির মতো। একবার শুরু হলে তা ছড়িয়ে পড়ে। যদি রাষ্ট্র দ্রুত ও শক্তভাবে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এটি ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সহিংসতার অস্ত্র হয়ে ওঠে।”
তীব্র আইনি সংস্কার ও সাহসী প্রয়োগ ছাড়া বাংলাদেশ এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ন্যায়বিচার নয়—ভয়, গুজব আর ক্রোধই রাজত্ব করবে।
