বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অর্জিত হয় এই খাত থেকে। তবে বর্তমানে এই শিল্প একের পর এক সংকটে জর্জরিত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক আরোপের শঙ্কা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ গ্যাস সংকট—দুইয়ের চাপে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত উৎপাদন
গত দুই সপ্তাহ ধরে অনেক পোশাক কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নেই বললেই চলে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক স্থগিত থাকায় কিছু অর্ডার বাড়লেও উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে গ্যাস সংকটে। ফলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে বিশ্বাসের সংকট দেখা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপ ও মূল্যছাড়ের কৌশল
যদিও শুল্ক বাড়ানো হয়নি, তবু মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক কারখানা থেকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি মূল্যছাড়ে পণ্য কিনতে চাইছে। অনেকে আবার পুরনো চুক্তির দামও কমাতে চাপ দিচ্ছে। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে অর্ডার বাতিল করছে।
রপ্তানি হ্রাসের ঝুঁকি ও পরিসংখ্যান
বিজিএমইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, পোশাক রপ্তানির ৮১ শতাংশ আসে ট্রাউজার, টি-শার্ট, সোয়েটার, শার্ট, ব্লাউজ ও অন্তর্বাস থেকে। অথচ গত দুই অর্থবছরে এই প্রধান পণ্যের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভ্যন্তরীণ সমস্যায় সংকট আরও ঘনীভূত
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, “একটা সংকট কাটতে না কাটতেই আরেকটা চলে আসছে। গ্যাস সংকটে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায়, ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না।”
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি আবদুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, “ক্রেতারা যেখানে কম দাম পাবে, সেখান থেকেই পণ্য কিনবে। অভ্যন্তরীণ সমস্যা দ্রুত সমাধান না করলে প্রতিযোগিতা হারানো অনিবার্য হয়ে পড়বে।”
সিপিডির বিশ্লেষণ ও পরামর্শ
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্য থেকে বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি শুল্ক আদায় করে। বিপরীতে, বাংলাদেশ পায় মাত্র ১৮০ মিলিয়ন ডলার। সিপিডি সুপারিশ করেছে, মার্কিন শুল্কের প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং কৌশলগত বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।
মার্কিন তুলা আমদানির সুযোগ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
বিটিএমএ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। এই প্রচেষ্টা সফল হলে, পোশাকশিল্প কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুল্ক ও গ্যাস সংকট সমাধানে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে।
