বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার আশা এখন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। দিনের পর দিন শেয়ারের দরপতনে পুঁজি হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশাবাদী হলেও, বাস্তবে বাজারের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং বাজারে আস্থাহীনতা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সূচকের ধারাবাহিক পতন
গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই সূচকের ধারাবাহিক পতন চলছে। সর্বশেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার, ডিএসইএক্স সূচক কমেছে ৫০ পয়েন্ট। গত ৯ কার্যদিবসে মোট ২৩৩ পয়েন্ট হারিয়েছে বাজার। এখন সূচক ৪,৯৭২ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা আগের তুলনায় অনেক কম। লেনদেনও কমে এসেছে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
আস্থার অভাবই মূল কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে দরপতনের প্রধান কারণ হলো আস্থার অভাব। ব্যাংক খাতে উচ্চ সুদের হার, ট্রেজারি বন্ডে আকর্ষণীয় রিটার্ন এবং মার্জিন ঋণের ফোর্সড সেল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে কিছু ব্যাংক ১১% বা তার বেশি সুদ দিচ্ছে, যা শেয়ারবাজারের তুলনায় বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশি লাভজনক মনে হচ্ছে।
বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি
বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান চেয়ারম্যান গত আট মাসে কার্যকর কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি। বরং বাজারে আরও অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এক পর্যায়ে ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫৭৭৫ পয়েন্টে, যা বর্তমানে ৮০০ পয়েন্টেরও বেশি কমেছে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও স্বল্পমেয়াদি সরকারের কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে ভালো আইপিও আসছে না, ব্যবসার লভ্যাংশও কমেছে। সব মিলিয়ে শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (NBFIs) অবস্থাও ভালো নয়। ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসছে না।
আশার আলো এখনো ক্ষীণ
আইসিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, কিছু অর্থনৈতিক সূচকে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও (যেমন রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির হার কমা), পুঁজিবাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বিএসইসির অবস্থান
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, বাজারে সংস্কার কার্যক্রম চলছে এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় নানান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ভালো কোম্পানির আইপিও না আসা এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর সীমাবদ্ধতাও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি।
সারসংক্ষেপ:
- বাজারে দুই মাসের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক দরপতন চলছে।
- বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট প্রকট হয়েছে।
- বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়েছে।
- রাজনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বাজারকে দুর্বল করে তুলেছে।
- বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি।
পরামর্শ:
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্থির করে বিনিয়োগ করা এবং পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ করা।
