ইউনুস সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরে নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পরিদর্শন নিয়ে বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ চট্টগ্রাম বন্দরে এক অপ্রত্যাশিত অতিথি—মার্কিন রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। গন্তব্য? বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT)।
দেখতে গেলে একে এককালীন ‘দলিল হস্তান্তরের’ আগাম রেইকি বলাই যায়। কেননা, ইতোমধ্যে ইউনুস সরকার এই টার্মিনালটি দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—ডিপি ওয়ার্ল্ড কি কেবল একটি বেসরকারি কোম্পানি, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা?
ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং মার্কিন নেভি: শুধুই ‘সহযোগী’?
ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি গ্লোবাল পোর্ট অপারেটর, যার কার্যক্রম ৭০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত। তবে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে এ কোম্পানির একটি ‘নিরবচারে গুরুত্বপূর্ণ’ বৈশিষ্ট্য—এটি মার্কিন নেভির একাধিক প্রজেক্টে সহযোগী হিসেবে কাজ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হলো, বন্দরের জাহাজ চলাচল থেকে শুরু করে কনটেইনার নিরাপত্তা, ডাটা এক্সচেঞ্জ এবং সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার এখন পরোক্ষভাবে হলেও একটি বৈদেশিক সামরিক কন্ট্রোলের আওতায় আসতে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রদূতের সফর: কূটনীতি না নজরদারি?
রাষ্ট্রদূত ট্রেসি জ্যাকবসনের হঠাৎ আগমন ও নির্দিষ্ট করে নিউমুরিং টার্মিনাল পরিদর্শন নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নানাবিধ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেন এই টার্মিনালই পরিদর্শনের জন্য বেছে নেওয়া হলো? মার্কিন কূটনৈতিক ভাষায় এটিকে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ আগ্রহ’ বলা হলেও, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে এটি স্পষ্টতই এক ধরনের ‘পূর্ব-তদন্তমূলক’ পর্যবেক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন যেখানে ভারত মহাসাগরে ‘String of Pearls’ নীতির আওতায় বন্দর নির্মাণে ব্যস্ত, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রও দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোতে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাক্সেস চায়। চট্টগ্রাম বন্দর তার জন্য একটি আদর্শ ক্ষেত্র।
জনস্বার্থ বনাম ভিনদেশী মালিকানা
সাধারণ জনগণের প্রশ্ন—বাংলাদেশের সার্বভৌম স্থাপনায় বিদেশি কর্তৃত্ব কতটা যৌক্তিক? বিশেষ করে, যেখানে স্বায়ত্তশাসিত বন্দর কর্তৃপক্ষ রয়েছে এবং যেখানে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের মতো বিষয় যুক্ত।
ইতোমধ্যে শ্রমিক সংগঠন ও বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহলে এই চুক্তির বিরুদ্ধে নানান বক্তব্য উঠে এসেছে। তাদের দাবি, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের পরিপন্থী।
চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি পোর্ট নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন। এমন একটি কৌশলগত স্থাপনা কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানির (যার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আছে) হাতে তুলে দেওয়া শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি কূটনৈতিক রূপরেখা বদলে দেয়ার মতো ঘটনা।
বর্তমানে দেশবাসীর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত। অন্যথায়, ইতিহাস একদিন এই ঘটনাকে দেখাবে ‘দেশ বিক্রির বন্দোবস্ত’ হিসেবে।
