২০২৫ সালে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের একের পর এক পুলিশ ও সেনা সদস্যের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও, ঘটনাগুলো ঘিরে তৈরি হচ্ছে প্রশ্ন—আত্মহত্যা না পরিকল্পিত হত্যা?

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আত্মহত্যার খবর আমাদের মাঝে নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন লক্ষ্য করা যায়, পরপর বেশ কয়েকজন সংখ্যালঘু—বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বী—সদস্য অদ্ভুতভাবে আত্মহত্যা করছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তখন বিষয়টি নিছক “ব্যক্তিগত হতাশা” বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
২০২৫ সালেই ঘটেছে অন্তত ছয়টি এমন মৃত্যু, যার প্রত্যেকটিকে পুলিশ ‘আত্মহত্যা’ বলে সমাপ্ত করতে চেয়েছে, অথচ তদন্ত নেই, ফরেনসিক বিশ্লেষণের অগ্রগতি নেই, নেই কোনো বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, আত্মীয়-পরিজন ও সহকর্মীদের মুখে চাপা পড়া একরাশ সন্দেহ।
✅ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
১. তৃষ্ণা বিশ্বাস, নারী কনস্টেবল (পটুয়াখালী) – জানুয়ারি ১৯
২. রুম্পা দাশ, নারী কনস্টেবল (বান্দরবান) – ফেব্রুয়ারি ১৭
৩. অনুপম কুমার ঘোষ, কনস্টেবল (সাতক্ষীরা) – ফেব্রুয়ারি ১৬
৪. কর্পোরাল দুর্জয় শীল দিলীপ, সেনা সদস্য (বনানী) – এপ্রিল ২১
৫. এএসপি পলাশ সাহা, র্যাব অফিসার (চট্টগ্রাম) – মে ৭
সবক’টি মৃত্যুকেই বলা হয়েছে “আত্মহত্যা”, এবং সবগুলোতেই সংশ্লিষ্টদের মুখে নিঃশব্দতা, প্রশাসনের তরফে কেবল প্রাথমিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে দায়মুক্তির প্রবণতা।
🔎 পলাশ সাহার মৃত্যু—বউ না অন্য কোনো শক্তি দায়ী?
এএসপি পলাশ সাহার মৃত্যু ছিল সবচেয়ে আলোচিত। একটি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ, একটি চিরকুট, এবং সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষিত “আত্মহত্যা”—কিন্তু কীভাবে? কেন? একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে কী এমন মানসিক চাপ ছিল, যা তাকে নিজের অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যায় বাধ্য করল?
অনেকে তার স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহকে দায়ী করছেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন এএসপি, যার চতুর্দিকে নিরাপত্তা, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ—সে কি সত্যিই এতটা দুর্বল ছিল? না কি কোনো অপারেশনাল ভেতরের দুনিয়া চাপা দিতে চাইল এমন একটি মৃত্যু?
🧩 আত্মহত্যার গল্প নাকি সিস্টেমেটিক টার্গেটিং?
যখন একই ধর্মীয় পরিচয়ধারী বাহিনী সদস্যরা একের পর এক আত্মহত্যার শিকার হন, তখন এটিকে নিছক “মানসিক চাপের ফল” বলে চালিয়ে দেওয়া একধরনের অসততা। বরং প্রশ্ন ওঠে—সংখ্যালঘু মানেই কি প্রেশার কুকারে ফেলা এক একটি মানবপ্রাণ?
এই মৃত্যুগুলোর পেছনে কি কোনো অপারেশনাল চাপে বাধ্য করা, অবমাননাকর আচরণ, অথবা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রতিশোধ রয়েছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভেতরের বৈষম্য?
⚖️ চাওয়া—স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত
এই কলামের উদ্দেশ্য কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করা। আমরা চাই:
- প্রতিটি মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক ও ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন।
- সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড, মানসিক ইতিহাসসহ সবকিছু বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট প্রকাশ।
- নিহতদের পরিবারের সঙ্গে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।
- সংখ্যালঘু সদস্যদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার জন্য বিশেষ মনিটরিং ইউনিট গঠন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র আমাদের সবার। এখানে সংখ্যালঘু–বহুমতের বাইরে—প্রতিটি নাগরিকই সমান মর্যাদার অধিকারী। আজ যদি আমরা পলাশ সাহার, তৃষ্ণা বিশ্বাসের, অনুপম ঘোষের মৃত্যুর সত্য জানতে না চাই, তবে আগামীকাল হয়তো সেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আরও অনেক “সন্তান”—যাদের দায় আমরা নেব না, ইতিহাস নেবে।
এই কলাম রাষ্ট্রের কাছে, প্রশাসনের কাছে, আর আমাদের বিবেকের কাছে একটি বার্তা:
👉 সত্য চাপা দেবেন না, ন্যায়বিচারের দরজা বন্ধ করবেন না।
✉️ পাঠকের মতামত পাঠান:
আপনি কি মনে করেন—এই মৃত্যুগুলো তদন্ত হওয়া উচিত? মতামত দিন নিচের কমেন্ট বক্সে।
