একজন প্রাক্তন সেনা সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোটা আন্দোলন ও বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভ্রান্তি নিয়ে বিশ্লেষণ। অতীতের ত্যাগ, বর্তমানের হতাশা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে নির্মোহ প্রতিচ্ছবি।

পাঠকের কলাম: 10 May, 2025;
কোটা আন্দোলন এর শুরু থেকে ০৫ আগস্ট পর্যন্ত আমি তৎকালীন সরকারের সকল কার্যক্রমের প্রতি অত্যন্ত সংক্ষুব্ধ ছিলাম। আমি মনে প্রাণে চেয়েছি সরকার পরিবর্তন হোক। কিন্তু যখন সত্যি তা হল, তখন অন্য এক বাংলাদেশ দেখলাম, যেই দেশটাকে আমি আর চিনি না। আজকের এই পরিস্থিতি দেখার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিল? যুক্তরাষ্ট্রের লোভনীয় স্কলারশিপ ছেড়ে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম দেশকে এভাবে দেখার জন্য না। এই পর্যায়ে এসে মনে হল যে কেন আমার এমন উপলব্ধি হয়েছে তা প্রকাশ করা আমার নৈতিক দায়িত্ব।
জুলাই অভ্যুথ্যানের ১০ মাস পরে জাতির কাছে এটা পরিষ্কার যে এটা কোন অভ্যুত্থ্যান ছিল না, এটা ছিল জুলাই সন্ত্রাস। তার মানে কী আমি মুগ্ধ, আবু সাঈদ, ইয়ামিন তথা অগনিত মানুষের মৃত্যুকে অস্বীকার করছি? অবশ্যই না। তবে এই সমস্ত মানুষগুলো, যাদের সামনে সুন্দর এবং সম্ভাবনাময় জীবন ছিল, তারা এবং জাতি হিসেবে আমরা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যবান। আমরা সকলেই একটি বিশাল ষড়যন্ত্রের মাঝে ডুবে গেছি। তবে আশার বাণী হচ্ছে এইযে এখনো আমাদের হাতে সুযোগ রয়েছে। দেশটাকে চাইলে আমরা এখনো রক্ষা করতে পারি।
আমি সংক্ষিপ্তভাবে বলে যাব, যা শুনেছি, যা দেখেছি এবং যা উপলব্ধি করতে পেরেছি। সিদ্ধান্ত আপনাদেরকে নিতে হবে।
হাসিনা সরকারের পতন আসলে কবে হয়েছিল?
এটা হয়েছিল ২৯ জুলাই ২০২৪ তারিখেই। সেদিন স্টাফ কলেজের কম্যান্ডান্ট সকল ছাত্র অফিসারদের সাথে একটি দরবার করে। ঐ সময়ের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে তাদের মনোভাব জানতেই এটার আয়োজন করা হয়েছিল। কিছু সেনা এবং নৌবাহিনীর জুনিয়র অফিসাররা স্পষ্টভাবে কমান্ড্যান্টকে জানান যে তারা মনে করে নিরীহ ছাত্রদের উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করছে। অধিকাংশই কোন মতামত প্রদান করেনি। তবে কম্যান্ডান্ট যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। বেশিরভাগ জুনিয়র অফিসারদের নীরবতায় যে মতামত প্রদানকারীদের প্রতি তাদের মৌন সমর্থন, তা কমান্ড্যান্ট বুঝতে পেরেছিলেন। এবং সেদিনই হাসিনা সরকারের প্রতি সামরিক বাহিনীর সমর্থন ও সহায়তা উঠে যায়। বিষয়টি পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হয় তার কয়েকদিন পরেই সেনা প্রধানের দরবারে। কেন জুনিয়র অফিসারদের মতামত এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা জনা দরকার।
বেসামরিক সরকার সবসময় চায় যে যাদের হাতে অস্ত্র আছে, তার যেন আস্থাভাজন হয়। বিষয়টা পৃথিবীর সব দেশেই একইরকম- নতুন সরকার আসলে তারা বাহিনী প্রধানদের পরিবর্তন করেন। একটু গভীরে ভাবুন- প্রকৃতপক্ষে বাহিনী প্রধান বা সিনিয়রদের অফিসারদেরও কিন্তু কোন ক্ষমতা নেই, যদি জুনিয়র অফিসাররা তাদের পাশে না থাকে। আমাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করুন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমরনায়করা কিন্তু সবাই ছিল জুনিয়র অফিসার (মেজর)। ৭৫ সাল থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমানের মৃত্যু পর্যন্ত, সব কিছুই সংগঠিত এবং সংঘটিত হয়েছিল এই মেজরদের মাধ্যমেই। আর বাংলাদেশে এতগুলো মেজর একসাথে আপনি পাবেন শুধুমাত্র স্টাফ কলেজেই। কাজেই তাদের মতামতই নির্ধারণ করে দেয়, সামরিক বাহিনীর সকল জুনিয়র অফিসাররা কী চায়, এবং সিনিয়র অফিসাররা তা করতেই বাধ্য ছিল।
জুনিয়র অফিসারদের কাছে কেন হাসিনা সরকার অজনপ্রিয় ছিল?
এর অনেক কারণ রয়েছে। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরছি। অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়া (৭৫-৮১ সাল) কিংবা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীন কাঠামো সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে হাসিনা সরকার ভুল স্ট্রাটেজি বেছে নেয়। বেসামরিক প্রশাসনে যেমন কর্তাব্যক্তি (সচিব, ডিসি, এসপি এবং ওসি) অনুগত থাকলেই চলে, সামরিক বাহিনীগুলো তেমনটি নয়। হাসিনা সরকার শুধুমাত্র সিনিয়র অফিসারদেরকেই অত্যন্ত বিশ্বাস করেছে। অন্যদিকে, এই সিনিয়র অফিসাররাই তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে যেয়ে সরকারের ভাবমূর্তি জুনিয়র অফিসারদের কাছে নষ্ট করেছে। ভারতের তাবেদারী
সীমান্তে কিছু কিছু সিনিয়র অফিসার কিন্তু ভারতীয়দেরকে কোন ছাড় দেয় নি। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। তাদের তো কিছু হয় নি। আবার কিছু অফিসার মনে করেছে কোন ঝামেলাই জড়ানো যাবে না। এই আদেশ গুলো যখন নিচে এসেছে, তখন তা সরকারেরই আদেশ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। একইভাবে কোন কোন নৌবাহিনীর কমান্ডার অবৈধ ভারতীয় জেলেদেরকে গ্রেফতার করতে দিয়েছে, আবার অনেকেই দেয় নি। যারা দেয়নি, তার নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার জন্য সরকারের আদেশ বলে চালিয়ে দিয়েছে। যারা ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তাদের অনেকেই উচ্চপদে গিয়েছেন। কিন্তু যারা নিলেন না, তার জুনিয়র কর্মকর্তাদের ভাবতে বাধ্য করলেন যে হাসিনা সরকার ভারতের তাঁবেদার। আমিও তেমনটাই ভেবেছি।
পররাষ্ট্রনীতি খোলাসা না করা
ভারত বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য নানাবিধ বাণিজ্যিক, ভ্রমণ ও অন্যান্য সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে। এখন কিন্তু এটা স্পষ্ট যে আমাদের কী পরিমাণ বাণিজ্যিক ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের রোগীর স্বল্পমূল্যে আর উন্নত চিকিৎসা পাচ্ছে না। বর্তমান সরকার কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারেনি। হাসিনা সরকারের পতনের পরই আমরা বুঝতে পারলাম যে, ভারতের সাথে সখ্যতা আমাদের জন্য লাভবানই ছিল। আমরা বলছি যে আদানির বিদ্যুতের দাম বেশি, কিন্তু বর্তমান সরকার কিন্তু এর থেকে কমদামে নতুন কোন উৎস খুঁজে বের করতে পারে নি, যেখানে কিনা তাবত শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ইউনুস সাহেবকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এটাই ছিল হাসিনা সরকারের দুর্বলতা- ভারতের সাথে বন্ধুত্বের কারণে আমরা কী সুবিধাগুলো পাচ্ছি তা ঢালাওভাবে প্রচার করে নি।
সামরিক ক্রয় দুর্নীতি
সামরিক বাহিনীর অস্ত্র গোলাবারুদ কেনার জন্য বরাবরই নিম্নমানের প্রতি প্রধান্য দেয়া হয়েছে। বাহিনীগুলোতে এটা কোন অজানা বিষয় না যে চীনারা আমাদের সিনিয়র অফিসারদেরকে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান করে দিয়ে এই নীতি গ্রহণ করিয়েছে। বিগত ১৬ বছরে এসকল নিম্নমানের অস্ত্রের জন্য ব্যাপক সামরিক জানমালের ক্ষতি হয়েছে। যারা মারা গিয়েছেন কিংবা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন তার কিন্তু সবাই হয় সৈনিক অথবা জুনিয়র অফিসার। অবশ্যই দুর্ঘটনা পরবর্তীতে বাহিনীর মধ্যে তদন্ত হয়েছে, তবে সমস্ত ক্ষেত্রেই দোষ দেয়া হয়েছে জুনিয়র অফিসার এবং সৈনিকদের পেশাগত দুর্বলতাকে। আমার অভিজ্ঞতার সুবাদে জানি যে, একটি দুর্ঘটনার রিপোর্টও নাই যেখানে বলা হয়েছে, এই অস্ত্রটি নিম্নমানের ছিল, সরকারের কেনা ঠিক হয়নি। এসমস্ত রিপোর্টগুলো গোপনীয় কিংবা অতি গোপনীয় হয়। বাহিনীর সবাই তা দেখে না, কিন্তু সবাই যেটা অনুমান করে- যেহেতু উপরমহল থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা, তার মানে এই দুর্নীতির সাথে সরকারও জড়িত।
অথচ, সরকারকে কখনোই জানানো হয়নি। কৌশলগত স্থাপনা দুর্নীতি পদ্মা সেতু, মাওয়া এক্সপ্রেস ওয়ে এবং দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর সম্মিলিতভাবে ছিল একটি মেগা মেগা প্রজেক্ট। সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার- দেশের পশ্চিমপ্রান্তের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মেগা স্কেল কর্মযজ্ঞের জন্য আমাদের সিভিল প্রশাসনের নেতৃত্ব, পেশাগত যোগ্যতা এবং সততা নিয়ে সরকার সঙ্গত কারণেই সন্দিহান ছিল। তাই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন সামরিক কর্মকর্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন পর্যায়ে। একজন অতি উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা করলেন কী- পায়রা বন্দরের জন্য প্রস্তুতকৃত Hydrographic Survey পরিবর্তন করে দিলেন। দেখালেন যে এখানে গভীর সমুদ্র বন্দর করা যাবে। কিন্তু, তিন বছর পরে দেড় বিলিয়ন ডলার খরচ করার পর দেখা গেল যে, এখানে গভীর বন্দর নির্মাণ সম্ভব নয়।
হাসিনা সরকার তখন টের পেল এবং বাজেট বন্ধ করে দিল, কিন্তু ইতোমধ্যে চীনাদের সাথে দুর্নীতিকারী সেই নৌ কর্মকর্তা অবসরে চলে গেছেন। আমরা জানতাম এখানে ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে, কিন্তু এটা ধরে নিয়েছিলাম যে এর সাথে সরকার জড়িত।অথচ, সরকারের কাছে কখনোই আসল Hydrographic Survey রিপোর্ট পাঠানো হয়নি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার যখন জানলো তখন কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না। ব্যাপারটা এত সহজ না। প্রথমত তিনি একজন উচ্চপদস্থ নৌ কর্মকর্তা, দ্বিতীয়ত এর সাথে কিছু চীনা উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ জড়িত ছিল। একইসাথে দেশের সামরিক বাহিনী এবং বিদেশী একটি পরাশক্তির সাথে পাঙ্গা নেয়ার ক্ষমতা কখনোই আমাদের দেশে কোন সরকারের ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে কিনা জানিনা।
অসন্তোষ, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও অতিভক্তি হাসিনা সরকারের শুরু থেকেই সামরিক বাহিনীগুলোতে ব্যাপক আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন নতুন অস্ত্র, যুদ্ব জাহাজ এবং জঙ্গিবিমান- তারমানেই পূর্বের তুলনায় অত্যধিক সৈনিক এবং অফিসার ভর্তি। যারফলে তাদের জীবনমানের ভয়ংকর অধঃপতন হয়। অফিসারদের শতভাগ বাসা দেয়ার কথা থাকলেও, অর্ধেকের বেশি অফিসারদের বাসা দিতে পারে না, সৈনিকদের থাকার জায়গা অত্যন্ত নিম্নমানের। অথচ এরা স্থল ও সমুদ্র সীমান্ত তথা জাতিসংঘ মিশনে কি পরিমাণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে। এসকল সমস্যাগুলো বিভিন্ন সময়ে সিনিয়র অফিসারদের দরবারগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিত্যুরে প্রত্যেকটি সিনিয়র অফিসার একটা কথাই বলেছে যে সরকারি বাজেট নাই। অথচ তার বলে নি, বিগত ১৬ বছরে তাদের জন্য কয়টি বিলাসবহুল দালান তুলেছে এবং অধস্তনদের জন্য প্রতিটি দালান তৈরিতে ৩-১০ গুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ ব্যয় করে বাজেট অপচয় করেছে।
আমরা ধরে নিলাম সরকার সামরিক বাহিনীকে দেখতে পারে না। এই ধারণা আরো বধ্যমূল হয়েছে অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণেও। হাসিনার আমলের শুরু থেকেই হঠাৎ করে কাজের চাপ বেড়ে যায়। সামরিক বাহিনীর চিরাচরিত রুটিন লাইফ শেষে হয়ে যায়। এ সময়ে, একজন অধঃস্তন কর্মকর্তা গড়ে দিনে ১৫-১৮ ঘণ্টা করে শ্রম দিয়েছে। এটা অমানবিক এবং পৃথিবীর কোন দেশে এমনটা আছে কিনা আমার জানা নেই। আমি একজন সিনিয়র অফিসারকে তার কাছাকাছি যেষ্ঠতার একজনকে বলতে শুনেছি জুনিয়র অফিসারদেরকে সবসময় ব্যস্ত রাখবা, যদি কোন কাজ না থাকে তাহলে ঘাস কাটা, স্টেজ সাজানো বা ষ্টল বানানোর কাজে লাগাবা। চিন্তা করার সময় যেন না পায়, ফ্রি টাইম পাইলে যেন ঘুমায়। এই অবস্থায় যখন সরকারি ছুটির দিন পাওয়া যেত, তখন সিনিয়র অফিসাররা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিত কে বেশি জাঁকজমকভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন কিংবা শোকদিবস পালন করবে। তখন বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠল জীবন ওষ্ঠাগত হওয়ার কারণ। আমাদের সিনিয়র অফিসাররা কখনোই সরকারকে এগুলো বলে নি। আর আমরা সবসময় ধরেই নিয়েছি সরকারই এগুলোর একমাত্র কারণ। সরকার সামরিক বাহিনীকে দেখতে পারে না।
কীভাবে জেনারেল ওয়াকার কোনঠাসা হয়ে পড়লেন?
জুনিয়র অফিসাররা যখন সরকার থেকে সমর্থন উঠিয়ে নিল, তখন আবির্ভাব হল একজন প্রকৃত মাস্টার মাইন্ডের। তিনি সেনা প্রধানকে ৭৫-৮১ সালের স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেন যে জুনিয়রদের মতামতের বিরুদ্ধে গেলে কত ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে, যদি জুনিয়র মেজররা তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়, তখন কে তাকে আশ্রয় দিবে। ইনি হচ্ছেন আমাদের নৌবাহিনী প্রধান এবং আলাপের সময়কাল ০৪ আগস্ট। মাহফুজ নামে পর্দার পেছনে কোন খেলোয়াড় নেই, ইনি ছিলেন আসল খেলোয়াড়, পাকিস্থানের দালাল। এখানে আমেরিকা কোন খেলোয়াড়ই না। তিনি এবং তার পাকিস্থানি-চীনা ভাইয়েরাই মিডফিল্ডার। আমি নিশ্চিত শেখ হাসিনা আমার এই লেখা পড়লে হতবাক হবেন। আমি দুঃখিত তবে এটাই সত্যি, এবং আপনার জীবনে এরকম খন্দকার মোস্তাক বারেবারে আসবে। রাষ্ট্রক্ষমতা নাকি অন্য আরও বড় কিছু, নৌবাহিনী প্রধান কি চান তা আমার জানা নেই। তবে তিনিই যে ছাত্র নেতাদের সামরিক উপদেষ্টা এবিষয়ে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের কোন সন্দেহ নেই। একাধিক নৌ কর্মকর্তা আমাকে নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি নিয়মিত ছাত্রনেতাদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। নৌসদর ক্যান্টনমেন্টের বাহিরে হওয়াই, এই সূক্ষ্ম কৌশলটি আমাদের দৃষ্টির বাহিরেই রয়ে গেল। তিনিই আবার বিগত সরকারের অনেক পদস্থ ব্যক্তিবর্গকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তাঁদেরকে নিরাপদে যেতে সহায়তা করেছেন। বিষয়টি এমন নয় যে, তিনি তাঁদের উপকার করতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন যেন জেনারেল ওয়াকার ছাত্র ও বর্তমান সরকারের কাছে এই বদনামের মূলভাগীদার হোক, সর্বদা তার সততা প্রশ্নব্রুদ্ধ হোক এবং কোণঠাসা হয়ে থাকুক। আমরা বুঝতেই পারলাম না তিনিই বর্তমান সময়ের একমাত্র সৎ সিনিয়র অফিসার।
আমেরিকা কী আসলেই সম্পৃক্ত?
আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনভাবেই মনে করি না। এটা যেমন সত্য যে আমেরিকা তার স্বার্থের জন্য সবকিছু করবে, এটাও সত্য যে তারা কখনো জঙ্গি ও উগ্রপন্থীদের সাথে তথা পাকিস্থানি এবং চীনাদের সাথে হাত মেলাবে না। আমি নিশ্চিত আমেরিকা কখনোই চায়নি যে, বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশ জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণ করুক। সেটা তাঁদেরই নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আমেরিকার মত উদারপন্থী, গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রের নুন্ন্যতম মূল্যবোধ রয়েছে, যেখান থেকে তারা কখনোই বিচ্যুত হবে না। আমরা আমেরিকা আমেরিকা বলে বলে পাকিস্থান এবং চীনকে উহ্য রেখেছি। কিন্তু আসল জঙ্গি অর্থ ও সমর্থনদাতা পাকিস্থান-চীন, সরকার পরিবর্তনে তারাই সব থেকে লাভবান হয়েছে। হয়ত এটা হতে পারে যে আমেরিকা বিষয়টি টের পেয়েছে বা পেয়েছিল, কিন্তু তারা দেখেনি অথবা দেখেও না দেখার চেষ্টা করেছে।
পাবলিক সেন্টিমেন্ট কীভাবে ঘুরানো হলো?
এখানে কোন মতামত বা উত্তর দিব না কারণ সেগুলো আমার জানা নেই। তবে কিছু প্রশ্ন করব। আমার মতে এই প্রশ্নগুলো সমগ্র জাতির, প্রত্যেকটি নাগরিকের করা উচিত।
আমি মনে করি আবু সাইদের মৃত্যু ছিল প্রথম টার্নিং পয়েন্ট। বর্তমান সরকার আবু সাইদের যে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সংশোধন করে প্রকাশ করেছে, সেখানে বলা আছে মাথায় আঘাত জনিত কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। অথচ, পুলিশ তাকে রাবার বুলেট দিয়ে গুলি করেছিল সামনে থেকে। গুলি খাওয়ার পরে যারা তাকে নিয়ে গেল, কেন ৫-৬ ঘণ্টা সময় নিল? তারা কেন সামনে এসে তাঁদের অভিজ্ঞ্যতা মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করে না? তারা আসলে কারা? আবু সাইদকে নিয়ে যাওয়ার সময় কীভাবে মাথায় আঘাত লাগলো? তাকে তো হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাহলে কে তার পক্ষ হয়ে গুরুতর আহত হিসেবে হাসপাতালে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত সাজিয়ে হৃদয়বিদারক ফেসবুক স্ট্যাটাস দিল?
দ্বিতীয় টারনিং পয়েন্ট ছিল মুগ্ধের মৃত্যু
ভিডিও ফুটেজ তো আছে? সেটা দেখে যেই পুলিশ গুলি করেছে তাকে কেন গ্রেফতার করা হল না? যেই দিন সন্ধ্যায় মুগ্ধ ফেসবুকে শিবিরকে আন্দোলন বানচাল না করার জন্য সতর্ক করল, তার পরের দিনই তাকে মরতে হল?
তৃতীয় টারনিং পয়েন্ট ছিল পুলিশের এপিসির উপরে ইয়ামিনের লাশ
আসলেই লাশ, কারণ ভিডিও ফুটেজে কাউকে গুলি করতে এবং গুলি খেয়ে তিনি এপিসি এর উপরে পড়ে গেছেন কেউ দেখেছেন কি? এপিসির ভিতর থেকে গুলি করা হলে লাশ কি রক্ত্যাক্ত থাকত না? পুলিশ অন্য কথাও গুলি করলে কেন নিজেদের এপিসি এর উপর লাশ উঠিয়ে মিডিয়াকে কাভার করবে? নাকি অন্য কেও চেয়েছিল পুলিশের এপিসি এর উপর একটি লাশ থাকলে সেটা মিডিয়া কাভার পাবে?
#দেশ এখন কি সঠিক হাতে রয়েছে? শেখ হাসিনা বা তার সরকার অপরাধ করেছে কি করেনি তা নিরপেক্ষ আদালতের বিচার্য বিষয় হতে পারে। কিন্তু, তার দোসররা কি সিরাজগঞ্জের থানায় গর্ভবতী নারী পুলিশকে হত্যা করেছিল?
#যে পুলিশ সদস্যদের মেরে লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হল তারা তো তখন ডিউটিতে ছিল না। তাহলে কে এবং কেন তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করলো?
#পুলিশের অস্ত্র এবং গোলাবারুদ কারা লুট করল? কেন সেগুলো এখনো পুরপপুরি উদ্ধার করা গেল না?
#০৫-১৬ আগস্ট জীবন্ত ধরে এনে জীবন্ত পুলিশের মাথা বারংবার কুপিয়ে মাথার ঘিলু এবং চোখ উপরে নারকীয় হত্যা কারা করলো?
#আবু সাইদ, মুগ্ধ ইয়ামিন আমাদের ভাই, এসকল পুলিশরা কি আমাদের কেও নন?
#সরকার কেন বর্তমান প্রশাসনকে এই সকল হত্যাকারীকে ধরতে নিষেধ করল?
#তারা কোন আইনের ভিত্তিতে এই অপরাধীদেরকে indemnity দিল?
#আজকে এটা মেনে নিলেন কালকে যদি আপনার বা আপনার প্রিয় কোন মানুষের সাথে এমনটা হয় তখন কেমন লাগবে?
#এদেরও কি মানবতা বিরোধী ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়া উচিত না?
#পুলিশ সদস্যরা আপনারা এটাকে কীভাবে মানিয়ে নিলেন, তারা কি আপনার সহকর্মী ছিল না?
(সামরিক বাহিনীতে কোন সহকর্মীর সাথে এমনটা হলে আমরা কখনো মেনে নিতাম না, কখনো নিবো না, মেজর সিনহা কিংবা লে কম্যান্ডার ওয়াসিফ এর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে!)
#যেই রাষ্ট্রযন্ত্র এই সকল অপকর্মের বৈধতা দিচ্ছে তারা কি ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত না? তাদের হাতে আমাদের দেশ কি নিরাপদ?
#যুদ্ধ শুরু হলে আপনি কী করবেন?
#ভারত এবং পাকিস্থান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের মিডিয়া ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা পাকিস্থানের হয়ে দালালি করছে। জঙ্গিবাদকে সমর্থন করছে।
#কাশ্মীরে যে নৃশংসতা হয়েছে তাতে কি আপনার মনে হয় না ভারতের ধৈর্য চ্যুতির সম্ভাবনা রয়েছে?
#আমরা কি ভারতের সাথে যুদ্ধে জড়াতে চাই?
#আমাদের কি সেই সক্ষমতা আছে?
#একটি যুদ্ধ করার জন্য যথাযত আদর্শগত, নীতিগত এবং রাজনৈতিক কারণ কি আছে?
#আপনি কি যুদ্ধে যেতে চান?
#বিনা কারণে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং আপনার পরিবারের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে চান?
#রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্থানকে সমর্থনের মাধ্যমে আমরা জঙ্গিবাদকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছি, সেটা কি আমেরিকা ভালভাবে নিবে?
#পশ্চিমা বিশ্বের কাছে আপনার দেশকে জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘর হিসেবে দেখতে চান?
#আপনি কী আপনার দায়িত্ব পালন করছেন?
আমরা কিন্তু প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নই। আমরা সাংবিধানিক বাহিনী, সংবিধানে স্পষ্ট করে লেখা আছে।
তাহলে রাষ্ট্রের সংবিধান রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব কি আপনার না? যার আইন বা সংবিধান সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞ্যান নাই, যিনি বোঝেন না যে ‘প্রজাতন্ত্র’ একটি আভিধানিক বাংলা শব্দ, যিনি রাষ্ট্রের নাম ‘জনগণমনতন্ত্রী’ রাখতে চান (যেই নামে কোন বাংলা শব্দ নেই) তার হাতে সংবিধান সংশোধন করতে দিবেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ব্যক্তি দিবালোকে একজন ছাত্রীকে সরাসরি বলল আপনার … বড় এগুলো ঢেকে রাখেন। আমরা কিছুই করলাম না। আপনাদের কি মনে হয় না এটার পুনরাবৃত্তি আমাদের মা, বোন, স্ত্রী অথবা প্রিয়তমার সাথে হতে পারে? তখন কি করবেন, এখন তো মেনে নিলেন?
উর্দুতে কাওয়ালি চলছে, জিন্নাহর মৃত্যু দিবস পালন হচ্ছে, শিবিরের পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে যে পাকিস্থান ভাগ করে বাঙালি মুসলমানরা ভুল করেছে, আপনি কি সত্যি তা মনে করেন? আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কি আপনার কোন গর্ববোধ নেই? আপনি কেন তা মেনে নিচ্ছেন?
যেই ছেলের দুইদিন আগে তিন বেলা ভাত আর রাতে থাকার জন্য বাপে টাকা দিতে পারত না, সে এখন কোটি কোটি টাকার গাড়ি নিয়ে শোডাউন করে? কোথায় পায় এই টাকা? এটা কি আমার আপনার ট্যাক্সের টাকা লুটপাট না? আমাদের জাতিসংঘ মিশনের রক্তঝরানো এবং প্রবাসী ভাইয়দের ঘামঝরানো রেমিটেন্সের টাকা না?
আমি যেই বিষয়গুলো নিশ্চিত জানি তা বর্ণনা করেছি, আর যার নিশ্চিত উত্তর আমার কাছে নেই তা শুধু প্রশ্ন আকারে লিখলাম। তবে মহান রাব্বুল আলামিন যেহেতু আমাকে কিছুটা জ্ঞ্যান আর বিচারবুদ্ধি দিয়েছে তাই সবপ্রশ্নগুলোর উত্তর অনুধাবন করতে পারি। আশা করি আমার ভাত্রি অফিসারবৃন্দরা আপনাদের বিচার বুদ্ধি দিয়ে উত্তরগুলো খুঁজে নিবেন। মনে রাখবেন আমাদের রাষ্ট্রের মানুষগুলো অত্যন্ত সহজ সরল। তারা আমাদেরকে অত্যন্ত বিশ্বাস এবং সম্মান করে। বাকিটা আপনাদের হাতে।
