ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক পদে হিযবুত তাহরীরের সাবেক শীর্ষ নেতার নিয়োগ নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন ফাঁস হয়েছে। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়াই এমন নিয়োগ প্রশাসনিক কাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর কী প্রভাব ফেলবে?

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা প্রতিবেদন ঘিরে রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মো. এজাজের নিয়োগ শুধু বিতর্কের জন্মই দেয়নি, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বড় প্রশ্ন তুলেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মো. এজাজ নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রপন্থি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের পঞ্চম শীর্ষ নেতা ছিলেন। ছাত্রজীবনে ইসলামি ছাত্র শিবিরে যুক্ত থাকার পর, ২০০২ সাল থেকে তিনি হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রমে সক্রিয় হন। ২০১৪ সালের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তিনি সংগঠনের অন্যতম সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবেও চিহ্নিত হন।

❝জঙ্গিদের পুনরুত্থানে রাজনৈতিক ছত্রছায়া-ক্ষমতার ছায়ায় উগ্রবাদের প্রসার?❞
এমন একজন ব্যক্তিকে কীভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হলো—তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা মহলে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই নিয়োগের আগে মো. এজাজের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নিরাপত্তা যাচাই (Vetting) বা ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমিনুল হক একে “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক এক চর্চা” হিসেবে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ সংগঠনের সাবেক নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো সুশাসনের ক্ষেত্রে একধরনের অন্তর্ঘাত। এর পেছনে বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে বলেই মনে হচ্ছে।”
বিশ্লেষকরা এটিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর আস্থা দুর্বল করার দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্রের অংশ বলেও দাবি করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ‘রাজনৈতিক সংকট’ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে একাধিক হিযবুত তাহরীর নেতাকে মামলায় খালাস দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে মো. এজাজও রয়েছেন। তার কয়েক মাসের মাথায় তিনি ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক নিযুক্ত হন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুসারে, ঐ সময়ের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় হিযবুত তাহরীর সরাসরি জড়িত ছিল এবং আন্দোলনের বিভিন্ন স্তরে তাদের সক্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই প্রসঙ্গে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা স্বীকারও করেন, তারা “প্রতিবাদী আন্দোলনের স্টেকহোল্ডার” ছিলেন।
প্রশ্ন উঠেছে, এমন একটি স্পর্শকাতর নিয়োগের পেছনে কারা আছেন? রিপোর্ট বলছে, ক্ষমতাধর উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের প্রভাবেই এজাজকে এই পদে আনা হয়। পরবর্তীতে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার সুপারিশে নিয়োগ চূড়ান্ত হয়।
তাদের এমন ভূমিকা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অস্বচ্ছ এবং পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হিযবুত তাহরীর দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে উগ্রবাদী রাজনীতি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা। এই সংগঠনের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের প্রশাসনিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তি শুধু নীতিগত নয়, নিরাপত্তাগত দিক থেকেও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
ড. ইউনূস সরকারের সঙ্গে জঙ্গি নেটওয়ার্ক জড়িত। “৫ আগস্টের ঘটনাকে কিশোর গ্যাং ও জঙ্গিদের সমন্বিত অভ্যুত্থান বলা যায়, যা বিদেশি ডিপ স্টেটের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছিল। এই ঘটনার পর জঙ্গি সংশ্লিষ্টদের একের পর এক খালাস পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।”
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো যখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতার চাপে ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন এমন বিতর্কিত নিয়োগ জনমনে আতঙ্ক ও সন্দেহের বীজ বপন করছে।
রাষ্ট্র যদি চিহ্নিত জঙ্গিদের নিয়োগ দিয়ে বার্তা দেয় যে অপরাধীরাও পুরস্কৃত হতে পারে, তাহলে জনগণের নিরাপত্তাবোধ, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের মৌলিক অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে।
