রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডিতে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দুটি নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটেছে। এই হত্যাকাণ্ড শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

ঢাকার বুকে যেন হঠাৎ করেই নেমে এলো এক রক্তাক্ত রাত। শুক্রবার রাতে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় দুটি আলাদা খুনের ঘটনা আতঙ্ক ছড়িয়েছে নাগরিক জীবনে। দুই তরুণ প্রাণ, যারা এক সময়ের স্বপ্ন আর সাধনার পথে এগিয়ে যাচ্ছিল—তাদের হঠাৎ থেমে যাওয়া নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দেয়।
ঘটনা এক: মোহাম্মদপুরে ফটোগ্রাফার নুর ইসলামের হত্যা
রাত ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরের দুর্গা মন্দির গলিতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন নুর ইসলাম (২৬)। বরিশালের সন্তান নুর পেশায় ছিলেন একজন অনুষ্ঠানের ফটোগ্রাফার। রাজধানীর ধানমন্ডির শংকর এলাকায় ভাড়া থাকতেন। তার বড় ভাই ওসমান গনি জানান, কোনো পূর্বশত্রুতা বা দ্বন্দ্ব ছিল না বলেই তাদের ধারণা। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—কে বা কারা তাকে হত্যা করল, কেনইবা এমন নৃশংসতা?
প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিল কয়েকজন যুবক। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পরিকল্পিত? না কি তাৎক্ষণিক কোনো দ্বন্দ্ব থেকে এ হত্যাকাণ্ড? পুলিশ তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।
ঘটনা দুই: ধানমন্ডির জিগাতলায় শিক্ষার্থী আলভীর নির্মম মৃত্যু
মাত্র ১৫ মিনিট পর, রাত সোয়া ৮টার দিকে ধানমন্ডির জিগাতলা এলাকায় ফের রক্তাক্ত দৃশ্য। ড. মালেকা কলেজের অনার্সের ছাত্র আলভী (২৭) ও তার বন্ধু আশরাফুল ইসলাম ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। আশরাফুল এখনো ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন। আলভীর জীবন শেষ হয়ে গেছে ডাকাতির মতো ঠুনকো কারণেই, না কি এও একটি পরিকল্পিত হামলা—তা নিশ্চিত নয় এখনো।
নিহতের মামি মাহি বেগম জানান, তারা কেবলমাত্র চা খাচ্ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিন-চারজন অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত এসে তাদের এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। ঘটনাটি রীতিমতো গ্যাং কালচারের একটি উদাহরণ কি না, তা নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
এক রাতে দুই খুন: কি বার্তা দিচ্ছে অপরাধচক্র?
মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি—দুটি এলাকাই রাজধানীর অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, জনবহুল এবং নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এমন জায়গায় এভাবে দুইজন যুবকের খুন হওয়া নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি কি কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের আগমনী বার্তা? না কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো গ্যাং কালচারের ভয়ংকর রূপ?
ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ জানান, ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। তবে ঘটনার প্রায় ১২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও হত্যার মোটিভ কিংবা অপরাধীদের সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা এবং হতাশা বিরাজ করছে।
এ ধরনের ঘটনা শুধুই আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি নয়, এটি সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিতও বটে। তরুণদের মধ্যে ছুরি, চাপাতি নিয়ে গ্যাং কালচারের প্রতি আকর্ষণ, হঠাৎ রাগ বা বিরোধকে প্রাণঘাতী আকারে নেওয়া, কিংবা অপরাধীদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এসব ঘটনার পেছনে দায়ী হতে পারে।
রাষ্ট্র এবং প্রশাসনের জরুরি করণীয় হলো—দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার এবং বিচার প্রক্রিয়ায় আনা। একই সঙ্গে সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনের শহরগুলো হয়ে উঠতে পারে আরেকটি অপরাধের স্বর্গ।
