সাম্য হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন শেষে টাঙ্গাইলের নাগরপুর সরকারি কলেজে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা একাদশ শ্রেণির ছাত্র শেখ সাইমকে কুপিয়ে আহত করেছে। ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন সহিংসতার আয়োজক ও ভূক্তভোগী—উভয়েই শিক্ষার্থী, তখন প্রশ্ন উঠে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা, মূল্যবোধ ও রাজনীতির নৈতিকতা নিয়ে। সাম্য হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধনের কয়েক মিনিট পরই যখন আরেক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হয় একই রাজনৈতিক দলের হাতে, তখন বিষয়টি নিছক ‘ঘটনা’ নয়—এটি আমাদের সমাজ ও রাজনীতির একটি ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
১৮ মে, রোববার দুপুরে টাঙ্গাইলের নাগরপুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণির ছাত্র শেখ সাইম তার পরীক্ষা শেষ করে বের হচ্ছিলেন। তখনই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তাকে কলেজ মসজিদ পর্যন্ত ধাওয়া করে দ্বিতীয়বারও মারধর করা হয়। হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মীর খালীদ মাহবুব রাসেল এবং সদর ইউনিয়নের সভাপতি ইয়ামিন আকাশ।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই হামলার কিছুক্ষণ আগেই তারাই ‘সাম্য হত্যার বিচার’-এর দাবিতে মানববন্ধন করেছিলেন।
একজন ছাত্র নিহত হওয়ার বিচারের দাবিতে যারা রাস্তায় দাঁড়ায়, তারাই আবার আরেক ছাত্রকে ছুরিকাঘাত করে? এটি কেবল রাজনৈতিক সন্ত্রাস নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক ও আদর্শিক দ্বিচারিতার নগ্ন প্রদর্শন। আমরা এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছি, যেখানে “বিচার চাই” স্লোগানটি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর বড় একটি অংশই ছাত্ররাজনীতির চাপে নিষ্পেষিত। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্বাধীন চিন্তার জায়গাগুলো একে একে দখল করে নিচ্ছে সহিংস সংগঠনগুলো। নাগরপুর কলেজের এই ঘটনাও তারই প্রমাণ।
শেখ সাইম কোনো রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তার পরিচয়—একজন কলেজ শিক্ষার্থী, একজন স্বপ্ন দেখা তরুণ। পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় সে নিশ্চয়ই ভাবেনি, তার শরীর রক্তাক্ত হবে ‘বিচার চাই’ বলা লোকদের হাতে। হামলার পর সহপাঠীরা যখন বলে, “তাহলে আমরা কার কাছে যাব?”, তখন সেটি কেবল এক ছাত্রের নয়—সমস্ত তরুণ সমাজের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
নাগরপুর কলেজের শিক্ষার্থীরা দ্রুত তদন্ত ও হামলাকারীদের শাস্তির দাবি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি সে বিচার আদৌ পাবে? রাষ্ট্র কি তাদের পাশে দাঁড়াবে? নাকি আবারও রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধীদের রক্ষা করবে?
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়, বরং একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া—আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সহিংস রাজনীতির কবলে পড়ছে, এবং আমরা কী করছি এই নৈরাজ্য রোধে?
নাগরপুর সরকারি কলেজের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—রাজনীতি যদি ছাত্রদের হাতে ছুরি তুলে দেয়, তবে সেই রাজনীতি আমাদের ভবিষ্যৎকে কেবল অন্ধকারেই ঠেলে দেবে। আমাদের এখন দরকার শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ, আদর্শভিত্তিক নেতৃত্ব ও রাজনীতির নামে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ।
